| বঙ্গাব্দ

আলবার্ট আইনস্টাইন কেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট পদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন?

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 31-05-2026 ইং
  • 7560 বার পঠিত
আলবার্ট আইনস্টাইন কেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট পদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন?
ছবির ক্যাপশন: আলবার্ট আইনস্টাইন

বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে ১৯৫২ সালে ইসরাইলের রাষ্ট্রপতির পদ অলঙ্কৃত করার জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ইসরাইলের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বায়োকেমিস্ট খাইম ভাইৎসম্যানের মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বছর ৭৩-এর আইনস্টাইন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন এবং ঐতিহাসিক নথির ওপর ভিত্তি করে আইনস্টাইনের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যান ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ইসরাইলের সেই ঐতিহাসিক আমন্ত্রণ ও আইনস্টাইনের প্রত্যাখ্যান

১৯৫২ সালে ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবন আলবার্ট আইনস্টাইনকে একটি চিঠি লেখেন।

  • আমন্ত্রণের শর্ত: চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এই পদ গ্রহণের জন্য আইনস্টাইনকে তাঁর বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন ত্যাগ করতে হবে না, তবে তাঁকে নিউ জার্সির প্রিন্সটন ছেড়ে ইসরাইলে চলে আসতে হবে।

  • আইনস্টাইনের বিনম্র অস্বীকৃতি: আইনস্টাইন এই আমন্ত্রণে গভীরভাবে অভিভূত হলেও তা গ্রহণে দুঃখ ও লজ্জাবোধ প্রকাশ করেন। তিনি চিঠিতে যুক্তি দেন:

    "আমি সারা জীবন বস্তুনিষ্ঠ সমস্যা নিয়ে কাজ করেছি, তাই মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে আচরণ করার কিংবা দপ্তরের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সহজাত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা আমার নেই।"

  • মানবিক বন্ধন: তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের বুকে নিজের নড়বড়ে অবস্থান উপলব্ধি করার পর থেকে ইহুদি জনগণের সাথে সম্পর্কই তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিক বন্ধন হয়ে উঠেছিল।

২. প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়নের গোপন স্বস্তি

আইনস্টাইনকে নিয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন লেখিকা অ্যালিস ক্যালাপ্রিস। তাঁর 'আইনস্টাইন এনসাইক্লোপিডিয়া' বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন ভেতরে ভেতরে আইনস্টাইনের এই প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তে বেশ সন্তুষ্টই ছিলেন।

  • রাজনৈতিক আশঙ্কা: বেন-গুরিয়ন উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, রাজনৈতিক বিষয়ে আইনস্টাইনের অকুতোভয় ও দুঃসাহসী দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে নিজের সরকারি নীতির বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করতে পারত।

  • প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য: প্রস্তাব দেওয়ার সময় বেন-গুরিয়ন তাঁর চিফ অব স্টাফ আইজ্যাক নাফোনকে বলেছিলেন— "এই পদের বিষয়ে তাকে প্রস্তাব দিতেই হতো, কারণ আমি না বলতে পারিনি। কিন্তু উনি যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তাহলে আমরা সমস্যায় পড়ব।"

৩. ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত ও আইনস্টাইনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক এম গেরম্যানের মতে, আইনস্টাইন জায়নবাদী (ইহুদি জাতীয়তাবাদী) আন্দোলনের সমর্থক হলেও তিনি এর একটি বিশেষ বামপন্থি শাখার প্রতিনিধিত্ব করতেন। রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব কিছু স্পষ্ট আদর্শ ছিল:

  • দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্রের সমর্থন: আইনস্টাইন ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদিদের সমান জাতীয় অধিকারসহ একটি "দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্র" প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে লেখা এক চিঠিতে তিনি জায়নবাদী আদর্শকে সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছিলেন একটি ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের মাধ্যম হিসেবে।

  • চরমপন্থার তীব্র বিরোধিতা: আইনস্টাইন ইসরাইলের ডানপন্থি ও চরমপন্থি আধাসামরিক গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের কঠোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে মেনাখেম বেগিনের (যিনি পরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হন) দল 'হারুত' এর নাৎসি ও ফ্যাসিবাদী দর্শনের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি এবং অন্য ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা নিউইয়র্ক টাইমসে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। এই দলটিই জেরুজালেমের কাছে দেইর ইয়াসিন গ্রামে শতাধিক ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা (গণহত্যা) করেছিল।

  • আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি প্রতিশ্রুতি: ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ রিচার্ড ক্রোকেটের মতে, আইনস্টাইনের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত নির্ধারিত হতো জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি তাঁর গভীর প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে।

৪. এক নজরে তৎকালীন ও বর্তমান ইসরাইলি রাজনীতির পরিবর্তন

তৎকালীন ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ থেকে সরে এসে ইসরায়েলের বর্তমান রাজনীতি উগ্র-ডানপন্থী, ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদ এবং ফিলিস্তিন নীতিতে চরম কঠোর অবস্থানে পৌঁছেছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণে সবচেয়ে आक्रामक ভূমিকা পালন করছে।
ইসরায়েলি রাজনীতির এই পরিবর্তনের তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
বৈশিষ্ট্যতৎকালীন রাজনীতি (১৯৪৮-১৯৯০ এর দশক)বর্তমান রাজনীতি (২০২০-এর দশক)
প্রধান আদর্শধর্মনিরপেক্ষ, লেবার জায়নিজমের প্রভাব।উগ্র-জাতীয়তাবাদ, রক্ষণশীল এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ।
নেতৃত্বের ধারাডেভিড বেন-গুরিয়ন বা গোল্ডা মেয়ারের মতো প্রতিষ্ঠাতাদের গণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক।দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আধিপত্য, যিনি ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন।
শান্তি প্রক্রিয়াফিলিস্তিনদের সাথে শান্তি আলোচনায় আগ্রহী ও দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাসী (যেমন: অসলো চুক্তি)।ফিলিস্তিনের সাথে শান্তি আলোচনা স্থগিত, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধিতা এবং একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা।
ভূ-রাজনীতিপ্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সরাসরি যুদ্ধ ও বৈরিতা।আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির মাধ্যমে বেশ কয়েকটি আরব দেশের সাথে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন।
অভ্যন্তরীণ নীতিবিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বজায় রাখা।বিচার বিভাগীয় সংস্কার ও আইনব্যবস্থা দুর্বল করার তীব্র চেষ্টা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ।
বসতি স্থাপনসীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত বসতি স্থাপন।অধিকৃত পশ্চিম তীরে তীব্র হারে নতুন ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: কন্টেন্ট ও স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট হিসেবে আমি মনে করি, আলবার্ট আইনস্টাইনের এই রাজনৈতিক অবস্থানটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির আলোকেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেকে আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইনস্টাইনের সেই পুরোনো চিঠিগুলোকে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ইসরাইল-পন্থী বা ইসরাইল-বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। তবে সত্য এটাই যে, আইনস্টাইন ইহুদিদের অধিকারের পক্ষে থাকলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর কোনো প্রকার অত্যাচার বা চরমপন্থাকে কখনোই সমর্থন করেননি। বর্তমান ইসরাইলি শাসনব্যবস্থায় (বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার) যেখানে ভিন্ন চিন্তাধারা বা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থকদের স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে, সেখানে আইনস্টাইনের এই আন্তর্জাতিকতাবাদী দর্শন মানবতার এক অনন্য দলিল হিসেবে টিকে রয়েছে।

অনুমোদিত লেখক: BDS Bulbul Ahmed

ডিজিটাল গ্রোথ, টেকনিক্যাল এসইও কনসালটেন্সি এবং কন্টেন্ট অপ্টিমাইজেশন স্ট্র্যাটেজি দেখতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency