| বঙ্গাব্দ

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল: ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে ইরান

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-06-2026 ইং
  • 3434 বার পঠিত
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল: ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে ইরান
ছবির ক্যাপশন: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল

৬০ দিনের ‘মেগা লাইসেন্স’: ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে সরাসরি ডলারে ইরানি তেল কিনছে মার্কিন কোম্পানি

আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬

সুদীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা অবসান বা শিথিল হওয়ার ফলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটনের এই নতুন নমনীয় নীতি যদি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকে, তবে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং নতুন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুবাদে আগামী মাত্র এক দশকের মধ্যেই ইরান সমগ্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী বৈশ্বিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ (The Economist)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ (US Department of the Treasury) আকস্মিকভাবে আগামী ৬০ দিনের জন্য ইরানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি ও সরবরাহের ওপর থাকা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিলের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়। এই বিশেষ লাইসেন্সের ফলে এখন থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলো সরাসরি তেহরানের কাছ থেকে তেল কিনতে পারবে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে সরাসরি ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে এবং পূর্বে মার্কিন প্রশাসনের কালো তালিকাভুক্ত থাকা ইরানি লাইটার ও মাদার ট্যাংকার থেকেও তেল সংগ্রহের আইনি সুযোগ পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম এত বড় ও বিস্তৃত পরিসরে ইরানি তেলের ওপর থেকে মার্কিন বিধিনিষেধ কার্যত তুলে নেওয়া হলো।

স্থবির তেল অর্থনীতিতে ১৫ লাখ ব্যারেলের জোয়ার

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একক তেল নিষেধাজ্ঞা মূলত শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। পরবর্তীতে ২০১০-এর দশকে ওবামার আমলে আরও কঠোর 'সেকেন্ডারি স্যাংশন' (Secondary Sanctions) আরোপ করা হয়, যাতে বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রও মার্কিন শাস্তির ভয়ে ইরানি তেল কেনা বা লেনদেন করতে না পারে। ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির (JCPOA) পর কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হলেও ২০১৮ সালে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়ে পূর্বের সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।

তবে জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এবারের জো বাইডেন প্রশাসনের সিদ্ধান্তটি অতীতের সমস্ত ছাড়ের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ও বিস্তৃত। এর মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান প্রধান আইনি ও কৌশলগত বাধাগুলো সাময়িকভাবে দূর হয়েছে এবং দেশটির ঝিমিয়ে পড়া জ্বালানি খাত এক লাফে নতুন করে গতি পেতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও জাহাজ চলাচল নজরদারি প্রতিষ্ঠান ‘ভরটেক্সা’ (Vortexa)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে যে ইরানের তেল রপ্তানি আন্তর্জাতিক চাপে প্রায় স্থবির অবস্থায় ছিল, তা বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেলে (1.5 Million Barrels) পৌঁছেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর আগে দেশটির যে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির সক্ষমতা ছিল, সেই আদি পর্যায়ে ফিরতে অবকাঠামোগত কারণে ইরানের আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

সস্তা তেলের দিন শেষ, দোটানায় চীন ও পুরোনো ক্রেতারা

The Economist জানাচ্ছে, তেলের বাজারে মার্কিন এই বড় ঘোষণার পরও বিশ্ববাজারে ক্রুড অয়েলের দামে বড় কোনো আকস্মিক ওঠানামা বা প্রভাব পড়েনি। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, গ্লোবাল মার্কেট আগেই ইরানি তেলের সরবরাহ বাড়ার বিষয়টি অনুমান করে দাম সমন্বয় করে নিয়েছিল। তবে রপ্তানির পরিমাণ আগের চেয়ে আরও বাড়াতে হলে ইরানকে এখন সম্পূর্ণ নতুন ক্রেতার সন্ধান করতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানের অধিকাংশ তেল গোপনে বা ডিসকাউন্টে কিনেছে চীনের ছোট ছোট স্বাধীন শোধনাগারগুলো (Teapots)। কিন্তু এখন মার্কিন ছাড়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেলের অফিশিয়াল দাম ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) তেলের মূল্যের কাছাকাছি চলে আসায় চীনের পক্ষে আগের মতো সস্তায় বা পানির দামে তেল কেনার সুযোগ আর নেই।

এ ছাড়া ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সম্ভাব্য নতুন ক্রেতাদের মধ্যে এখনও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অনিশ্চয়তা ও ভয় কাজ করছে। কারণ হোয়াইট হাউসের এই বিশেষ ছাড় আপাতত মাত্র ৬০ দিনের ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে কার্যকর করা হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং যুক্তরাজ্যের (UK) নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল থাকায় অনেক আন্তর্জাতিক বড় ব্যাংক, সমুদ্র বিমা প্রতিষ্ঠান ও লজিস্টিক ব্যবসায়ীরা এখনই ইরানের সঙ্গে বড় আকারে সরাসরি বাণিজ্যে জড়াতে আগ্রহী হচ্ছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রক্ষেপণ, এই মার্কিন লাইসেন্স যদি পর্যায়ক্রমে দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকে, তাহলে ভারত ও জাপানের মতো পুরোনো বিশ্বস্ত ক্রেতারাও আবার খুব দ্রুত পুরোদমে ইরানি তেল আমদানি শুরু করবে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি ও ১ দশকের সমৃদ্ধি

এদিকে, বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত মধ্যপ্রাচ্যের ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz) নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন যেভাবে তেহরানের কাছ থেকে সুফল পাওয়ার আশা করেছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কারণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রাথমিক দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ইরান আবারো কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) জানিয়েছে, তারা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের বাণিজ্যিক চলাচল আগের চেয়ে আরও বেশি সক্রিয় ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সাথে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সমন্বয়ের জন্য একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা (Hotline) চালু করবে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে শুধু তেলের আন্তর্জাতিক রপ্তানিই বাড়ছে না, বরং এর ফলে ইরানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তেল মজুত বা ভাসমান স্টোরেজের চাপ কমছে, খনিগুলোর উৎপাদন বাড়ছে এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক পরিবহন ও থার্ড-পার্টি আর্থিক লেনদেনের অতিরিক্ত ছদ্মবেশী ব্যয় এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমে যাচ্ছে। ফলে প্রতি ব্যারেল তেল অফিশিয়াল ডলারে বিক্রি করে তেহরান আগের তুলনায় দ্বিগুণ নেট মুনাফা ঘরে তুলতে পারছে। বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন—মার্কিন এই নমনীয় নীতি যদি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকে এবং এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের শত শত বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজড ফান্ড বা সম্পদ মুক্ত হওয়া, আঞ্চলিক ট্রানজিট ফি এবং মার্কিন প্রতিশ্রুত আর্থিক প্রণোদনা যুক্ত হয়, তবে আগামী ২০৩৬ সালের মধ্যেই ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ সমৃদ্ধশালী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এক নজরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও ইরানের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি (জুন, ২০২৬)

  • মূল ঘোষণা: যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ কর্তৃক ৬০ দিনের জন্য ইরানি তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল।

  • বিশাল পরিবর্তন: ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম সরাসরি ডলারে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে তেল কেনার বৈধ অনুমতি দান।

  • রপ্তানি গ্রাফ: মে মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে ইরানের বর্তমান তেল রপ্তানি দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত (ভরটেক্সার তথ্য)।

  • ভূ-রাজনৈতিক মোড়: নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরও হরমুজ প্রণালি আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিল তেহরান।

  • দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা: অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত হলে আগামী এক দশকে পারস্য উপসাগরের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র হবে ইরান।

বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ওপেক (OPEC) প্লাসের সর্বশেষ তেল উৎপাদন নীতি, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের পরবর্তী ৬০ দিনের লাইসেন্সের মেয়াদ বৃদ্ধির খসড়া, হরমুজ প্রণালির সামরিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সব এক্সক্লুসিভ খবরের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency