আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ০৯ জুন, ২০২৬
ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিতে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন মোড় এসেছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামগ্রিক জন্মহার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রয়োজনীয় সূচকের চেয়েও নিচে নেমে গেছে।
ভারত সরকারের সাম্প্রতিক ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ (এসআরএস) পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে—ভারতে প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার এখন ১.৯, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সূচক ২.১-এর চেয়ে অনেক কম। উল্লেখ্য, ২০০০ সালের দিকেও ভারতে এই হার ছিল ৩.৩। জন্মহারের এই নাটকীয় পতন ভবিষ্যতে তীব্র শ্রমশক্তি ঘাটতি ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির মতো এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের মতে, নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবস্থার সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ভারতে জন্মহার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি বর্তমান যুগোপযোগী ও কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সন্তান লালন-পালনের খরচ অত্যাধিক বেড়ে যাওয়াও দম্পতিদের কম সন্তান নেওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ।
এছাড়া দেশে শিশু মৃত্যুর হার ২০১৯ সালের প্রতি হাজারে ৩০ জন থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২০২৪ সালে ২৪ জনে নেমে এসেছে। শিশু মৃত্যুর এই আশাব্যঞ্জক হ্রাসও দম্পতিদের মনে এক ধরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, যার ফলে বেশি সন্তান নেওয়ার পুরোনো প্রবণতা কমে গেছে।
তবে এই জন্মহারের পতন পুরো ভারতজুড়ে সমান নয়, যার ফলে তীব্র আঞ্চলিক বৈষম্য ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পিছিয়ে থাকা বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মতো তুলনামূলক দরিদ্র উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলোতে জন্মহার যথাক্রমে ২.৯ এবং ২.৬, যা এখনো বেশ উচ্চ। অন্যদিকে, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অধিকারী রাজধানী দিল্লির জন্মহার মাত্র ১.২ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ু ও কেরালায় এই হার ১.৩। এই তারতম্যের কারণে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জনসংখ্যার এই ভারসাম্যহীনতা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি স্থায়ী সংকট তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালের পরবর্তী সময়ে নতুন আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে ভারতের লোকসভার আসন বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ (Delimitation) হওয়ার কথা রয়েছে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই সংসদে অধিক আসন পেয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
এই বিষয়টি জন্মহার নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া দক্ষিণের উন্নত রাজ্যগুলোকে চরম ক্ষুব্ধ করছে। তারা মনে করছে, সফলভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নীতি বাস্তবায়ন করে তারা রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে উল্টো বৈষম্য ও শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে।
একই সঙ্গে এই সরকারি জনসংখ্যা সংক্রান্ত তথ্য ভারতের ধর্মীয় রাজনীতির একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ও উগ্র ধারণাকেও সম্পূর্ণ খণ্ডন করেছে। ভারতের হিন্দু ডানপন্থী ও উগ্র গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মাঠে দাবি করে আসছিল যে, মুসলিমদের জন্মহার হিন্দুদের চেয়ে বহুগুণ বেশি এবং তারা একসময় সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবে।
কিন্তু ভারতের অফিশিয়াল তথ্য বলছে, গত তিন দশকে ভারতে অন্য যেকোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর চেয়ে মুসলিমদের জন্মহার সবচেয়ে দ্রুত গতিতে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের জন্মহার ৪.৪১ থেকে উল্কার বেগে কমে ২.৩৬-এ দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ৩.৩ থেকে কমে ১.৯৪ হয়েছে। বর্তমান এই সমীক্ষা স্পষ্ট করছে যে, সব ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের সামগ্রিক জন্মহারই এখন নিম্নমুখী।
২০০৫ সাল থেকে ভারত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা কর্মক্ষম যুব জনসংখ্যার এক সুবর্ণ যুগে প্রবেশ করেছে, যা ২০৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার কথা ছিল। চীন বা জাপানের মতো দেশ এই যুব শক্তির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারলেও, ভারত এখনো বিপুল বেকারত্ব নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে সেই সুযোগ হারাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, জন্মহার এভাবে কমতে থাকলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ভারত একটি কর্মক্ষমতাহীন প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে, যা উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি কমিয়ে দেবে এবং রাষ্ট্রের ওপর বিপুল স্বাস্থ্য ও পেনশনের আর্থিক বোঝা চাপাবে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় স্তরে এখনো বড় কোনো নীতি ঘোষণা করা না হলেও, দক্ষিণের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য ইতোমধ্যে জনসংখ্যা ধরে রাখতে তৃতীয় ও চতুর্থ সন্তান জন্মদানের জন্য বিশেষ আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলো প্রথমবার মা-বাবা হতে যাওয়া দম্পতিদের উৎসাহিত করতে সরকারি অর্থায়নে বিনামূল্যে আইভিএফ (IVF) সেন্টার চালু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জন্মহার বাড়াতে জোর করার চেয়ে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |