আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অন্যায় ও জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে (পুশইন) বলে এক আন্তর্জাতিক তদন্তে জানিয়েছে বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) নিউ ইয়র্ক ও লন্ডন থেকে একযোগে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তে বসবাসকারী বহু মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং যথাযথ নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে না দেওয়ায় অনেক নিরীহ পরিবার দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ‘জিরো লাইনে’ (নো-ম্যানস ল্যান্ড) চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে যাচ্ছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত বিএসএফের অন্তত ২১টি অবৈধ ‘পুশইন’ প্রচেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশু ও নারীসহ ২০০ জনেরও বেশি বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হওয়ার পর রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একটি বিতর্কিত ও কট্টর নীতি গ্রহণ করেছেন। তার ঘোষিত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্তকরণ, ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার) নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে বাঙালিদের আটক করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে দাবি করেছেন যে, ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে সীমান্ত পার করে ‘ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে’।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী ভারতের এই আগ্রাসী নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন:
"ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে অত্যন্ত নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ভারত সরকারকে এই অবৈধ ও একতরফা বহিষ্কার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সমন্বয় করতে হবে।"
সংস্থাটি মাঠ পর্যায়ে অন্তত নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তারা জানিয়েছেন, রাতের আঁধারে বিএসএফ বিভিন্ন দলকে ট্রাকে করে সীমান্তে নিয়ে এসে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। কয়েকটি ঘটনায় বিজিবি কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ পরে বাধ্য হয়ে তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয়।
পঞ্চগড় সীমান্ত (৫ জুন): বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা সীমান্তে শিশুসহ ১০ জনকে পুশইন করার চেষ্টা করলে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে টানা ৭৫ ঘণ্টার এক চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন জানান, প্রথম রাতে প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে ছিল পরিবারগুলো। কয়েক দফা ফ্ল্যাগ মিটিং ব্যর্থ হওয়ার পর বিএসএফ তাদের ফেরত নিয়ে যায়।
ঠাকুরগাঁও সীমান্ত (৬ ও ৮ জুন): ৬ জুন ভোরে দুইটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে এবং ৮ জুন জিরো লাইনে এক গর্ভবতী নারী ও তার সন্তানসহ ১১ জনকে বিএসএফ পুশইন করার চেষ্টা করে। বিজিবির অনড় অবস্থানের কারণে দীর্ঘ সময় সীমান্তে আটকে থাকার পর বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধনকে দায়ী করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় অত্যন্ত বিতর্কিত ও তড়িঘড়ি প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যার সিংহভাগই মুসলিম। নাম বাদ পড়ার পরপরই পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দিচ্ছে। এর আগে ২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যের নাগরিকত্ব যাচাই (NRC) প্রক্রিয়ায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও সম্প্রতি গর্ব করে দাবি করেছেন যে, তারা বাংলাভাষী মুসলমানদের ধরে সরাসরি সীমান্তের ওপারে পুশইন করছেন।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কোনো ব্যক্তিকেই বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। যেকোনো প্রত্যাবর্তন হতে হবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক নাগরিকত্ব যাচাইকরণ প্রক্রিয়া মেনে।
| প্রধান তথ্য ও সূচক | বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান |
| বিজিবির প্রতিরোধ | ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত ২১টি পুশইন চেষ্টা প্রতিহত। |
| আক্রান্তের সংখ্যা | শিশু ও নারীসহ ২০০-এর বেশি মানুষকে পুশইনের চেষ্টা। |
| পশ্চিমবঙ্গের নীতি | মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতি। |
| মূল জটিলতা | পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ নাম বাদ। |
| আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন | যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (Due Process) ও আপিলের সুযোগ ছাড়া জোরপূর্বক বহিষ্কার। |
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |