মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর শেষ হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় এবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে স্বাগত জানাতে জমকালো প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্বের দুই প্রধান পরাশক্তি ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের শীর্ষ নেতার এই বেইজিং সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে একই দেশে আমেরিকা ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের এমন ব্যাক-টু-ব্যাক সফর অত্যন্ত বিরল, যা প্রমাণ করে যে বেইজিং দ্রুত বৈশ্বিক কূটনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু (Diplomatic Epicenter) হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
সোমবার (১৮ মে, ২০২৬) চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এই সফরের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।
তথ্যমতে, আগামী ১৯ ও ২০ মে (মঙ্গল ও বুধবার) রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিংয়ে অবস্থান করার কথা রয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল সফরের প্রাক্কালে গত রোববার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে অপরকে বিশেষ ‘অভিনন্দন বার্তা’ পাঠিয়েছেন।
শি জিনপিং তাঁর বার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের ৩০ বছর পূর্তির এই ঐতিহাসিক বছরে রাশিয়া ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ‘আরও গভীর ও সুসংহত’ হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, এই সফর দুই দেশের মধ্যকার "সীমাহীন বন্ধুত্বকে" (No-Limits Partnership) এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই মস্কোর প্রতি বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চীনের কাছে রাশিয়ার গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর থেকে চীন তার বিশাল অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে রাশিয়ার পাইপলাইন ও স্থলপথের জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রয়: ফিনল্যান্ড-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত বেইজিং রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৩৬৭ বিলিয়ন ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রয় করেছে।
ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিলে জোগান: চীন বর্তমানে রাশিয়ার মোট বৈশ্বিক রপ্তানির চার ভাগের এক ভাগেরও (২৫%) বেশি পণ্য একা ক্রয় করছে, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ক্রেমলিনকে যুদ্ধের বিশাল ব্যয় মেটাতে এককভাবে সাহায্য করছে।
আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিল-এর সিনিয়র ফেলো জোসেফ ওয়েবস্টার তাঁর এক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, শি-পুতিনের এই আসন্ন মহাবৈঠকের মূল অলিখিত বিষয় হতে পারে ‘তাইওয়ান সংকট’।
বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হলো—ভবিষ্যতে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত সৃষ্টি হলে, সামুদ্রিক পথ অবরুদ্ধ হলেও যেন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র থাকে। আর এই লক্ষ্যেই মস্কোর সাথে আরও দীর্ঘমেয়াদি জীবাশ্ম জ্বালানি চুক্তি সই করতে চায় চীন।
অন্যদিকে, রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ (Power of Siberia 2) মেগা গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য চীনকে তাগিদ দিয়ে আসছে। এই প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বছরে আরও ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হবে। এটি রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্পূর্ণ পুষিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শতভাগ নিশ্চিত করবে।
১. আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম (মূল উৎস): The Guardian (UK) এবং Global Times (China) — বেইজিংয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের আসন্ন দ্বিপাক্ষিক সফর ও শি জিনপিংয়ের অভিনন্দন বার্তা সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন (১৮ মে ২০২৬)। ২. জ্বালানি গবেষণা সংস্থা: Centre for Research on Energy and Clean Air (CREA) — রাশিয়া-চীন জীবাশ্ম জ্বালানি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান রিপোর্ট। ৩. ভূ-রাজনৈতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক: Atlantic Council — সিনিয়র ফেলো জোসেফ ওয়েবস্টার কর্তৃক তাইওয়ান সংকট ও ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইনের কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
উপসংহারে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায়ের পরপরই পুতিনের এই বেইজিং আগমন ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বার্তা। আমেরিকা যখন ইরান ও রাশিয়াকে একযোগে চাপে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে, তখন চীন একই সপ্তাহে দুই পক্ষকে সামলে বিশ্বমঞ্চে নিজের একক মধ্যস্থতাকারী ও পরাশক্তি ইমেজের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।
প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed
পোর্টফোলিও ও যোগাযোগ:
আরও ভূ-রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক খবরের আপডেট জানতে চোখ রাখুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |