আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনীতি ডেস্ক | আল আরাবিয়া
সর্বশেষ আপডেট: ১৫ জুলাই, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ও যুদ্ধ পরিস্থিতি এক নজিরবিহীন এবং অত্যন্ত ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই, ২০২৬) ইরানের স্পর্শকাতর সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে মার্কিন বিমানবাহিনী জোরালো বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে পুনরায় নৌ-অবরোধ (Naval Blockade) আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
এরই তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পালটা জবাব হিসেবে উপসাগরীয় ৩টি দেশে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে মার্কিন আগ্রাসন ও নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz) সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোর ওপর প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পিছিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় এই ভয়াবহ হামলা ও পালটা হামলার ঘটনা ঘটল। এই সামরিক সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে একলাফে ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের বিশেষ এলিট সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, নতুন করে মার্কিন বেআইনি অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে ইরানের তেল ও গ্যাস রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর ব্যবহারকারী মার্কিন মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহের পথও বন্ধ করে দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
বিবৃতিতে আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় হুংকার দিয়ে জানায়:
“এই অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানির পথ হয় সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো এটি আর কারো জন্যই খোলা থাকবে না।”
এদিকে, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা ও আগ্রাসী অবরোধের সিদ্ধান্ত গত মাসে হওয়া দ্বিপাক্ষিক শান্তি আলোচনার অন্তর্বর্তীকালীন ‘ইসলামাবাদ স্মারক’ চুক্তিকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।”
চলমান সংঘাতের পঞ্চম দিনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা ইরানের উপকূলবর্তী ও প্রণালির নিকটবর্তী ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে ভারী বোমাবর্ষণ করেছে। ইরানি গণমাধ্যমগুলোও দেশটির বিখ্যাত বন্দর নগরী আব্বাস, কৌশলগত কিশ দ্বীপ এবং বন্দর ইমাম খোমেনিতে একাধিক বিকট বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন হামলার পর পরই পারস্য উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনজুড়ে যুদ্ধের সাইরেন বেজে ওঠে। একই সময়ে কুয়েত ও জর্ডান তাদের আকাশসীমায় ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করার দাবি করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) দাবি করেছে, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রধান সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সফলভাবে নিখুঁত ড্রোন ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।
⚔️ মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ২০২৬ (৫ম দিনের চিত্র):
• মার্কিন হামলা: বন্দর আব্বাস, কিশ দ্বীপ ও বন্দর ইমাম খোমেনির ডজনখানেক ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ।
• ইরানের পালটা আঘাত: বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
• হরমুজ প্রণালি: ইরানের সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ; নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ।
• বিশ্ব অর্থনীতি: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে ১০% বৃদ্ধি।
• প্রাণহানি: বিগত ১ সপ্তাহে মার্কিন হামলায় ইরানে অন্তত ২৮ জন নিহত।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন গণমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তেহরান যদি অবিলম্বে এই সংঘাত থামিয়ে নিঃশর্ত আলোচনায় না বসে, তবে আগামী সপ্তাহেই ইরানের প্রধান প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সেতুগুলোতে আরও বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হবে।
মার্কিন সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, বিগত সপ্তাহে ইরান আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইচ্ছাকৃতভাবে অন্তত সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে অন্তত ১২ জন বেসামরিক ক্রু নিহত, নিখোঁজ বা গুরুতর আহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার ওমান উপকূলে একটি নরওয়েজিয়ান ট্যাংকারে রহস্যময় বিস্ফোরণ ঘটে এবং কুয়েতের একটি নৌযান ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে, চলমান এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে কঠোরতম ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইসরাইলের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র সমৃদ্ধ শহর দিমোনা (Dimona) থেকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন:
“আমাদের সীমানায় বা ইসরাইলি স্বার্থে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে তার উপযুক্ত ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। আমাদের ওপর নির্বিঘ্নে হামলা চালিয়ে কেউ পার পেয়ে যাবে—সেই সোনালী দিন এখন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।”
মধ্যপ্রাচ্যের এই ত্রিমুখী সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্বজুড়ে একটি বড় ধরনের জ্বালানি সংকট ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |