জাতীয় ও রাজনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬
১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে বেশ কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন নিজের জটিল হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য সরকারি তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৮১ লাখ ৯১ হাজার টাকা নিয়েছেন। একই সময়ে সাবেক অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তাঁর স্ত্রীর ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়েছেন ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।
বিদ্যমান আইনি বিধি অনুযায়ী, মন্ত্রী-উপদেষ্টা ও তাঁদের স্বামী বা স্ত্রী সরকারি খরচে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার আইনগত অধিকারী। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাত্র ১৮ মাসের দায়িত্বকালেই চিকিৎসা বাবদ এককভাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া নৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে খোদ সুশীল সমাজ ও জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় খরচে স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ে সমালোচনার মুখে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী পারভীন আহমেদ তিনি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগে থেকেই মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। পরে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করানো হয়।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন:
"আমার স্ত্রীর অসুস্থতার শেষ এক বছরে শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছিল। এর আগে আমি সম্পূর্ণ নিজের খরচে স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য জাপানে নিয়ে গিয়েছিলাম। সরকারি সুবিধায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার সময় আমি নিজে তিন-চারবার সেখানে গিয়েছি এবং প্রতিবারই আমার নিজের বিমানভাড়া ও হোটেল খরচ আমি নিজেই বহন করেছি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আমি সেসব খরচও যদি সরকারের কাছে দাবি করতাম, তাহলে মোট বিলের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হতো। আমি সব সময় শতভাগ সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে প্রচলিত একটি বহু পুরোনো আইনের আওতায় এই চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হয়। এটি এই সরকারের সময়ে নতুন চালু করা হয়নি। সবকিছু শতভাগ নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে, তাহলে এখানে নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন?"
উল্লেখ্য, গত বছর (২০২৫) প্রকাশিত সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের নিজস্ব সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭.১৬ কোটি টাকা এবং তাঁর স্ত্রী পারভীন আহমেদের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫.৩৮ কোটি টাকা।
ব্যাপক গণসমালোচনার পর রোববার (২৮ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে নিজের বিপুল চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
তিনি জানান, ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয় যে তাঁর হার্টে ‘ক্যাথেটার অ্যাবলেশন’ নামে একটি অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি না থাকায় বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই সেটি করা সম্ভব ছিল না। চিকিৎসকেরা তাঁকে আবুধাবিতে অবস্থিত একটি মার্কিন হাসপাতাল অথবা থাইল্যান্ডের ব্যাংককস্থ বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জরুরি পরামর্শ দেন।
খালিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় ব্যাংককের ওই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয় করেন। পরে চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি মাসে একই হাসপাতালে মূল জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য আরও ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, যা নিয়মানুযায়ী সরকার পরিশোধ করে। তিনি আরও দাবি করেন, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিলে বড় ছাড় দেওয়ায় মূল খরচের পরিমাণ অনেক কমে এসেছে।
প্রকাশিত সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, আ ফ ম খালিদ হোসেনের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.১৪ কোটি টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪.১১ লাখ টাকা।
দুই সাবেক উপদেষ্টার বড় অঙ্কের খরচের বিপরীতে অন্য সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের চিকিৎসা ব্যয়ের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে বেশ কম। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তালিকা অনুযায়ী ব্যয়ের বিবরণী নিচে দেওয়া হলো:
| সাবেক উপদেষ্টা/সহকারীর নাম | দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রণালয় | রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নেওয়া চিকিৎসা ব্যয় |
| মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান | সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা | ৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা |
| হাসান আরিফ | সাবেক ভূমি উপদেষ্টা | ২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা |
| ড. এম আমিনুল ইসলাম | সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা | ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা |
| আলী ইমাম মজুমদার | সাবেক খাদ্য উপদেষ্টা | ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা |
| ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ | সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা | ৬৭ হাজার টাকা |
| আদিলুর রহমান খান | সাবেক শিল্প উপদেষ্টা | ৩১ হাজার টাকা |
| ড. আনিসুজ্জামান | প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী | ২১ হাজার টাকা |
| শেখ মইনউদ্দিন | সাবেক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) | ৪ হাজার টাকা |
১৮ মাসের এই সংক্ষিপ্ত শাসনামলে একদিকে দেশের সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত, তখন জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে উপদেষ্টাদের এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শীর্ষ ব্যয়: সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা খালিদ হোসেন নিজের হার্টের অপারেশনে নিয়েছেন ৮১.৯১ লাখ টাকা।
দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যয়: সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ স্ত্রীর ক্যানসারের চিকিৎসায় নিয়েছেন ৭৯.৩৮ লাখ টাকা।
আইনি বৈধতা: দুই উপদেষ্টাই জানিয়েছেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রচলিত আইন ও নিয়ম মেনেই এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্যদের চিত্র: ফাওজুল কবির খান ৫.৩৯ লাখ এবং হাসান আরিফ ২.৬৭ লাখ টাকা চিকিৎসা বাবদ নিয়েছেন।
নূন্যতম ব্যয়: সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মাত্র ৬৭ হাজার এবং শেখ মইনউদ্দিন নিয়েছেন ৪ হাজার টাকা।
স্টাফ রিপোর্টার
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সরকারি সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত আইনের সর্বশেষ সংশোধনীর আপডেট, সাবেক উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণীর লাইভ ডাটা, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসা প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং জাতীয় রাজনীতির সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |