আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০২৬
ইসরাইলের সাথে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পর থেকে গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় প্রতিদিন গড়ে একটি করে ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF)। গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর ক্রমাগত ও নৃশংস হামলার মুখে এই কথিত যুদ্ধবিরতিকে একটি ‘নিষ্ঠুর এবং মারাত্মক বিভ্রম’ হিসেবে বর্ণনা করেছে সংস্থাটি।
শুক্রবার (১৯ জুন) জেনেভায় সংবাদমাধ্যমের সামনে এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বৈরিতা অবসানের (যুদ্ধবিরতি) আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী অন্তত ২৬৫ জন ফিলিস্তিনি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে সময়টি আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সংযম এবং শিশুদের সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত ছিল, সেই তথাকথিত শান্তির সময়েও আট মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে একটি করে শিশু নিহত হয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, এই ক্রমাগত শিশু মৃত্যু প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধবিরতি কতটা ফাঁপা এবং এটি ফিলিস্তিনি শিশুদের ইসরাইলি বিমান ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এল্ডার বলেন, "বিশ্ব যখন টেবিল-বৈঠকে যুদ্ধবিরতির ভাষা নিয়ে কথা বলছে, তখন গাজার অসহায় পরিবারগুলো প্রতিদিন তাদের নিষ্পাপ ছেলে-মেয়েদের দাফন করতে বাধ্য হচ্ছে।"
ইউনিসেফের মুখপাত্র জানান, গাজার শিশুরা এখন আর তাদের নিজেদের বাড়ি, বিদ্যালয় কিংবা খেলার মাঠের মতো জনসমাকীর্ণ স্থানেও নিরাপদ নয়। এমনকি ফুটবল খেলার সময় কিংবা সমুদ্রতীরে মাছ ধরার সময়ও তারা ইসরাইলি বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের কয়েকটি লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন:
ইসরাইলি বাহিনীর সরাসরি গুলিতে এক ২ বছর বয়সি শিশু নিহত হয়েছে।
নিজের তাঁবুর ভেতরে ঘুমন্ত বা বসা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে এক ১৩ বছর বয়সি কিশোর।
ইসরাইলি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এক ৫ বছরের শিশু এবং তার বাবা।
জেমস এল্ডার জানান, শুধু মৃত্যুই নয়, অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ৪০০-রও বেশি শিশু গুরুতরভাবে আহত হয়েছে, যাদের অনেকের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং এই আঘাত তাদের চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো। তিনি সতর্ক করে বলেন, শত শত শিশুর জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। কিন্তু গাজার সীমান্তগুলোতে ইসরাইল কর্তৃক প্রয়োজনীয় লাইফ সেভিং ওষুধের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আহত শিশুদের ক্ষতস্থানে মারাত্মক ইনফেকশন (সংক্রমণ) ছড়াচ্ছে এবং এতে নতুন করে অঙ্গচ্ছেদের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
তাঁবুর ভেতরে থাকা অবস্থায় এক ১২ বছর বয়সি শিশুর বুকে গুলি করা এবং ঘরের ভেতরে থাকা অবস্থায় ইসরাইলি কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে ছোঁড়া গুলিতে ৩ বছর বয়সি এক শিশুর মুখমণ্ডল ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। ইসরাইলের দখলদারিত্বের তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ ও ‘অরেঞ্জ লাইন’ সীমানার ক্রমাগত সম্প্রসারণের দিকে ইঙ্গিত করে এল্ডার বলেন, "অরেঞ্জ লাইনের কাছাকাছি একটু জোরে হাঁচি দিলেও আপনাকে বা আপনার শিশুকে গুলিবিদ্ধ হওয়া লাগতে পারে।"
মানবাধিকার কর্মীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি ইসরাইলি অবরোধ এবং সামরিক বিধিনিষেধের কারণে গাজার শিশুরা একটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। টানা কয়েক মাসের বোমাবর্ষণ ও অবরোধের কারণে হাসপাতালগুলো ওষুধ, জরুরি মেডিকেল জ্বালানি, পর্যাপ্ত কর্মী এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র ও তীব্রতর সংকটে ভুগছে।
গাজার শিশুদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে এল্ডার বলেন, "গাজার শিশুদের জন্য মৃত্যুভয়, স্বজন হারানো এবং চোখের সামনে সহিংসতা দেখা এতটাই নিয়মিত ও স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ট্রমা বা মানসিক আঘাত এখন আর তাদের জীবনের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি তাদের শৈশবের পরতে পরতে মিশে গেছে।" তিনি অবিলম্বে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধ সমস্ত সরকার ও বৈশ্বিক সংস্থাকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি লেবাননের পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি জানান, সেখানেও গত ২ মার্চ থেকে সহিংসতা বৃদ্ধির পর ইউনিসেফের তথ্যমতে ২৪৭ জন শিশু নিহত এবং ৯৯২ জন শিশু আহত হয়েছে।
এদিকে, গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি বর্বর হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩,০১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৩,২৭৩ জনে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের ১১ অক্টোবর ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি হামলায় নতুন করে ১,০০৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩,১৬৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া উদ্ধারকারী দলগুলো ইতোপূর্বে দুর্গম ও ধ্বংসস্তূপ এলাকাগুলো থেকে আরও ৭৮৪ জনের পচনশীল মরদেহ উদ্ধার করেছে।
| সূচক ও অঞ্চল | গাজা উপত্যকার চিত্র | লেবাননের চিত্র |
| যুদ্ধবিরতির পর শিশু মৃত্যু | কমপক্ষে ২৬৫ জন (প্রতিদিন গড়ে ১টি শিশু) | — |
| যুদ্ধবিরতির পর শিশু আহত | ৪০০ জনেরও বেশি (পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে) | — |
| সামগ্রিক শিশু হতাহত (সর্বশেষ সংঘাত) | — | ২৪৭ জন নিহত, ৯৯২ জন আহত |
| ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে মোট মৃত্যু | ৭৩,০১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত | — |
| ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে মোট আহত | ১৭৩,২৭৩ জন ফিলিস্তিনি আহত | — |
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবাধিকার ডেস্ক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
হামাস-ইসরাইল যুদ্ধ, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং জাতিসংঘের সব এক্সক্লুসিভ খবরের লাইভ আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |