আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ০৯ জুন, ২০২৬
ইসরাইলি হেফাজতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনসহ ভয়াবহ ও পদ্ধতিগত নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্রে সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দিরা তাদের ওপর হওয়া এই অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক ও তদন্তকারীদের মতে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এই চরম যৌন সহিংসতা মূলত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটিকে একটি ‘যুদ্ধের অস্ত্র’ (Weapon of War) হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গাজার সাবেক সরকারি চাকরিজীবী মুহাম্মদ আল-বাকরি ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনের সেই দুঃসহ স্মৃতির চারণ করে জানান, তাকে এবং আরও সাতজন বন্দিকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে, চোখ ও হাত বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। এরপর ইসরাইলি সেনা ও রক্ষীরা তাদের ওপর পাশবিক যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ চালায়।
আল-বাকরি অত্যন্ত যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বলেন, “আমরা যখন তীব্র যন্ত্রণায় সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছিলাম, তখন ইসরায়েলি সেনারা অট্টহাসি হাসছিল এবং সেই নারকীয় দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিল।” তিনি আরও জানান, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে বন্দিদের ওপর হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দিয়েও যৌনাঙ্গে কামড়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হতো।
অনুরূপ এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ‘জব’ ছদ্মনামের গাজার এক সাধারণ দিনমজুর। তিনি জানান, ইসরাইলি নারী সেনারা তার হাত-পা বেঁধে মেঝেতে চেপে ধরে কৃত্রিম বস্তু ব্যবহার করে তাকে বর্বরভাবে ধর্ষণ করে। সে সময় চারপাশের অন্যান্য পুরুষ সেনারা হাততালি দিচ্ছিল এবং পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার বিষয়ে তথ্য আদায়ের নামে এই সাধারণ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর এমন ভয়াবহ প্রতিশোধমূলক নির্যাতন চালানো হয়, অথচ এই ঘটনার সাথে তাদের দূরতম কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন নির্যাতনের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো হলেও, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে এই বর্বরতা নজিরবিহীন ও ন্যাক্কারজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে ইসরাইল কর্তৃক পদ্ধতিগতভাবে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ব্যবহারের অকাট্য প্রমাণ মেলে।
যার ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘ কর্তৃক ইসরাইলকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতা চালানো দেশের ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং খোদ ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বি’তসেলেম’ এই পৈশাচিক সংস্কৃতিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের জঘন্য অপরাধের জন্য কোনো ইসরাইলি সেনা বা রক্ষীকে আজ পর্যন্ত শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ‘সদে তেইমান’ ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে দলবদ্ধ ধর্ষণের সিসিটিভি ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর ১০ জন রক্ষীকে সাময়িক আটক করা হলেও, পরবর্তীতে ইসরায়েলি কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ ও উগ্র জনতার বিক্ষোভের মুখে তাদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়। উল্টো ধর্ষণের সেই ভিডিও ফাঁসের অপরাধে মেজর জেনারেল ইফাত তোমের-ইয়েরুশালমি নামে এক নারী সামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ভিডিও প্রকাশ হওয়াকে অপরাধ হিসেবে না দেখে, দেশের জন্য একটি মারাত্মক ‘পাবলিক রিলেশনস (PR) বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেন। এমনকি ইসরাইলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ কট্টরপন্থী দল লিকুদ পার্টির সদস্য হ্যানোক মিলউইডস্কি প্রকাশ্যেই চিৎকার করে বলেন, “ফিলিস্তিনি বন্দিদের মলদ্বারে রড ঢুকিয়ে ধর্ষণ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি করার পূর্ণ অধিকার আমাদের সেনাদের রয়েছে।”
জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আল জাজিরাকে বলেন, “এই সুপরিকল্পিত নির্যাতনের উদ্দেশ্য কেবল বন্দিদের শারীরিক কষ্ট দেওয়া নয়, বরং একজন মানুষের আত্মসম্মান, মর্যাদা ও মানসিক সত্ত্বাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসরাইলি সমাজ ও রাজনীতিতে ফিলিস্তিনিদের ‘মানব পশু’ হিসেবে চিত্রায়িত করে চরম অমানুষিকরণ (Dehumanization) করা হচ্ছে, যার ফলে সেনারা যেকোনো জঘন্য অপরাধ করেও রাষ্ট্রীয়ভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে।
अंतरराष्ट्रीय আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন এই ধরনের যৌন সহিংসতা কোনো রাষ্ট্রে বিচ্ছিন্নভাবে না ঘটে বরং সুপরিকল্পিত এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ঘটে, তখন তা আন্তর্জাতিক রোম সংবিধি অনুযায়ী সরাসরি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ (Crime Against Humanity) হিসেবে গণ্য হয়। গাজায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় কাগজে-কলমে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হলেও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, গণগ্রেপ্তার এবং কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাদের ওপর এই পদ্ধতিগত নির্যাতন ও ধর্ষণ এখনো অবলীলায় অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |