| বঙ্গাব্দ

লেবাননের মুক্তি দিবসে হিজবুল্লাহর পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় জানাল ইরান

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-05-2026 ইং
  • 15737 বার পঠিত
লেবাননের মুক্তি দিবসে হিজবুল্লাহর পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় জানাল ইরান
ছবির ক্যাপশন: আব্বাস আরাগচি

লেবাননের মুক্তি দিবসে হিজবুল্লাহর পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ইরানের: মার্কিন চাপের মুখেও অবিচল তেহরান

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই লেবাননের ঐতিহাসিক ‘প্রতিরোধ ও মুক্তি দিবস’ উপলক্ষে দেশটির সরকার, সাধারণ জনগণ এবং প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহর প্রতি বিশেষ অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি এবং হিজবুল্লাহর বর্তমান মহাসচিব নাঈম কাসেমের কাছে পাঠানো পৃথক দুটি চিঠিতে আরাগচি হিজবুল্লাহ ও বৈরুতের প্রতি তেহরানের অবিচল ও কৌশলগত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

২০০০ সালের মে মাসে দক্ষিণ লেবানন থেকে দখলদার ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লেবাননের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় ইরান সর্বদা দৃঢ়ভাবে পাশে থাকবে।

১. ওয়াশিংটনের নিন্দা ও লেবাননবাসীকে উস্কানির জবাব

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জোরালো বিবৃতিটি এমন এক সময়ে এলো, যার ঠিক আগেই মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করার জন্য হিজবুল্লাহর তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে রুবিও লেবাননের সাধারণ জনগণকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসার এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই যৌথ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপের বিপরীতে গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা লেবাননকে কোনো অবস্থাতেই একা ফেলে যাবে না। যুদ্ধ অবসানের জন্য যেকোনো ধরণের চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় লেবানন ও হিজবুল্লাহর হাত ইরান আরও শক্ত করে ধরে রাখবে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে।

২. লেবানন যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মার্কিন-ইসরাইল অক্ষের অবস্থান

গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া লেবাননের ওপর ইসরাইলি বিমান ও স্থল হামলায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

  • ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান: ইসরাইলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৩,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ সাধারণ নাগরিক।

  • চুক্তি নিয়ে ধোঁয়াশা: এই মানবিক সংকটের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সম্ভাব্য বৈশ্বিক চুক্তির আলোচনায় লেবানন যুদ্ধের স্থায়ী অবসান অন্তর্ভুক্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে এখনও আন্তর্জাতিক মহলে ধোঁয়াশা কাটেনি।

  • ট্রাম্পের সবুজ সংকেত: এদিকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পক্ষ থেকে লেবাননের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গত রবিবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননসহ সবকটি ফ্রন্ট থেকে আসা হুমকির বিরুদ্ধে ইসরাইলের ‘আত্মরক্ষার অধিকারের’ বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করেছেন।

লেবানন সংকট: পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর অবস্থান ম্যাট্রিক্স

২০২৬ সালের মার্চ মাসে মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলার প্রেক্ষিতে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ নতুন করে শুরু হওয়ার পর, লেবানন সংকট এখন এক ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। এই সংঘাত কেবল দক্ষিণ লিটানি নদীর অববাহিকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের একটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
নিচে লেবানন সংকটে বিশ্ব পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর অবস্থান এবং কৌশলগত লক্ষ্যের একটি ম্যাট্রিক্স দেওয়া হলো:
পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর অবস্থান ম্যাট্রিক্স
পক্ষ / রাষ্ট্রসংকটে ভূমিকা ও অবস্থানপ্রধান কৌশলগত লক্ষ্যবর্তমান নীতি ও পদক্ষেপ (২০২৬)
যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েলের প্রধান সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থক।মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের 'প্রক্সি' নেটওয়ার্ক দুর্বল করা এবং লেবাননকে ইরানের প্রভাবমুক্ত করা।ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সমর্থন জোগানো এবং বৈরুতকে তেহরানের থেকে আলাদা করে একটি স্বাধীন শান্তি চুক্তিতে বাধ্য করার চেষ্টা।
ইসরায়েলপ্রত্যক্ষ আক্রমণকারী ও আগ্রাসনকারী পক্ষ।হিজবুল্লাহকে সীমান্ত থেকে হঠানো এবং দক্ষিণ লেবাননে ৫-১০ কিমি গভীর একটি স্থায়ী 'বাফার জোন' বা প্রভাব বলয় তৈরি করা।দক্ষিণ লেবাননে স্থল আক্রমণ তীব্র করা, ব্যাপক বিমান হামলা চালানো এবং নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী সাময়িকভাবে সেনা অবস্থান ধরে রাখা।
ইরানহিজবুল্লাহর প্রধান অর্থ ও অস্ত্রদাতা এবং আঞ্চলিক অভিভাবক।অক্ষ-শক্তি (Axis of Resistance) টিকিয়ে রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দরকষাকষিতে লেবাননকে রাজনৈতিক গুটি হিসেবে ব্যবহার করা।হিজবুল্লাহকে রকেট ও ড্রোন দিয়ে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং ইসরায়েলের ওপর আঞ্চলিক চাপ সৃষ্টি করা।
আরব লীগ (সৌদি আরবকাতার)মধ্যস্থতাকারী এবং ভারসাম্য রক্ষাকারী।লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশটিতে ইরানের একক আধিপত্যের অবসান ঘটানো।লেবাননের জন্য একটি ব্যাপক 'আরব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয়' তৈরির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং মানবিক সহায়তা প্রদান।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (বিশেষ করে ফ্রান্স)কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তাকারী।লেবাননের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়া রোধ করা এবং একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা।জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UNIFIL)-এর ভবিষ্যত নিশ্চিত করা এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় তহবিল সংগ্রহ করা।
রাশিয়াচীনসতর্ক পর্যবেক্ষক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী।মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকানো এবং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা।জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন ঘরানার খসড়া প্রস্তাবের বিরোধিতা এবং পক্ষগুলোকে সংযত হওয়ার আহ্বান।
সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব ও বর্তমান চিত্র
  • মানবিক বিপর্যয়: যুদ্ধের ফলে লেবাননের মোট জনসংখ্যার ২০%-এরও বেশি (প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ) অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ৩,০০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
  • অর্থনৈতিক ধস: ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া মন্দা এই যুদ্ধের ফলে আরও তীব্র হয়েছে এবং প্রায় ১.২৪ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
  • নিরাপত্তা পরিষদের সংকট: লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিরক্ষা মিশন (UNIFIL)-এর ম্যান্ডেট ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলায় এর কার্যকারিতা এখন চরম হুমকির মুখে। 

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, লেবানন ও হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে মার্কিন-ইসরাইল অক্ষ এবং ইরানের এই দড়ি টানাটানি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ক্ষমতার ভারসাম্যের অংশ। ওয়াশিংটন যেখানে হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে চায়, সেখানে ইরানের এই বার্তা প্রমাণ করে যে, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির টেবিলেও তেহরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের স্বার্থকে সবার ওপরে রাখবে।

৩. ভবিষ্যতের শান্তি চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কেবল তখনই সম্ভব, যখন ওয়াশিংটন এবং তেহরান উভয়েই একটি সামগ্রিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টর ইসরাইলপন্থী অবস্থান এবং ইরানের প্রতিরোধের নীতি—এই দুইয়ের মুখোমুখি অবস্থানে লেবাননের সাধারণ মানুষের ভাগ্য ও নিরাপত্তা আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency