ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ: ১৯৫০ থেকে ২০২৫—বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক পতন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ হওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। বুধবার বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কথা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল আলম স্পষ্ট করে বলেন, "যেহেতু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন তাদের দল হিসেবে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, সেহেতু দলটির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।"
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মে মাসে (প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ২০২৫-এর সমসাময়িক সিদ্ধান্ত) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫০-এর দশকে যে দলটির হাত ধরে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন দানা বেঁধেছিল, ২০২৫ সালে এসে সেই দলটিই আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায়।
ভাষা আন্দোলন ও স্বায়ত্তশাসন (১৯৫০-১৯৭০): ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ পরবর্তীতে 'আওয়ামী লীগ' নাম ধারণ করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নেতৃত্ব দেয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। ১৯৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় দেশটিকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়।
স্বাধীনতা ও বাকশাল (১৯৭১-১৯৭৫): ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেও ১৯৭৫ সালে প্রবর্তিত 'বাকশাল' ছিল দলটির ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায়। ওই বছরই ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায় দলটি।
পুনরুত্থান ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন (১৯৮১-১৯৯০): ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলটি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে।
ক্ষমতার পালাবদল (১৯৯৬-২০০৮): ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। এরপর ২০০১ সালে ক্ষমতা হারালেও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে দলটি।
ফ্যাসিবাদী তকমা ও ২০২৪-এর মহাপ্রলয়: ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় থাকাকালে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে দলটির বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় দলটিকে 'ফ্যাসিস্ট' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ২০২৫ সালের রাজনৈতিক সমীকরণে দলটি এখন পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পাঁচ আইনপ্রণেতার প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শফিকুল আলম জানান, তিনি এ ধরনের কোনো চিঠি এখনও দেখেননি। তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত কোনো শক্তির নির্বাচনে আসার সুযোগ বর্তমান আইনি কাঠামোতে নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৫০ সাল থেকে যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাঙালির পথচলা শুরু হয়েছিল, ২০২৪-২৫ সালের এই পরিবর্তন সেই আকাঙ্ক্ষারই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এই পতন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সূত্র: ১. প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ও ফরেন সার্ভিস একাডেমি সংবাদ সম্মেলন। ২. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের গেজেট ও প্রজ্ঞাপন। ৩. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় ঐতিহাসিক আর্কাইভ (১৯৫০-২০২৫)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |