প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জীবন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি মেডিকেল বোর্ড তাঁকে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর, ২০২৫) দিবাগত মধ্যরাতে বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার তথ্য নিশ্চিত করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে একইসাথে অনুরোধ জানানো হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বশীলতা বজায় রেখে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ধরনের তথ্য যেন প্রচার না করা হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের দ্রুত আরোগ্য কামনায় মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া ও প্রার্থনা অব্যাহত রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বেগম খালেদা জিয়ার এই গুরুতর অসুস্থতা এবং তাঁর চিকিৎসা নিয়ে চলা টানাপোড়েন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী (১৯৫২ থেকে ২০২৫) দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এই সংকট শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর নয়, বরং দেশের অস্থির গণতন্ত্রের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন।
রাজনৈতিক চেতনার জন্ম হয়েছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এই আন্দোলনই পূর্ব বাংলার স্বাধিকারের ভিত্তি গড়ে তোলে, যা ১৯৫০-এর দশককে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক নতুন জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড দেশের রাজনীতির মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়।
১৯৭৫ সালের আগস্ট: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের ডানপন্থী নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালের নভেম্বর: একই বছর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
স্বৈরশাসনের পতনের লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে বেগম খালেদা জিয়া দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন।
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ (নভেম্বর ১৯৮৭): স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তরুণ যুবক নূর হোসেন তার পিঠে "স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক" স্লোগান লিখে জীবন উৎসর্গ করেন। এই সময়কালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে জোরালো গণতন্ত্রের লড়াই শুরু হয়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সামরিক শাসককে ক্ষমতা ছাড়তে হয়, যার ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনীতিতে চরম বিভাজন, সহিংসতা ও সংঘাতের চিত্র উঠে এসেছে।
৫ জানুয়ারি ২০১৪: বিএনপি-জোটের বর্জনের মধ্য দিয়ে একতরফা সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
৫ আগস্ট ২০২৪: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সিসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা, তাঁর জীবন নিয়ে উদ্বেগ, এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাঁর অনুপস্থিতি—এই সবকিছুই বাংলাদেশের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ইতিহাসেরই অংশ, যেখানে ক্ষমতা, সংকট ও নেতৃত্বের স্বাস্থ্য বারবার আলোচনায় এসেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার এই সঙ্কটময় মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ ও মন্তব্য উঠে এসেছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাকে নির্দেশ করে:
ডা. মঈন খান (বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য): শুক্রবার (২৮ নভেম্বর, ২০২৫) মধ্যরাতে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "আজ মেডিকেল বোর্ড বসেছিল, বোর্ড তার (খালেদা জিয়া) সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করেছে এবং যা যা করা দরকার, তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।"
মির্জা আব্বাস (বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য): একই রাতে খালেদা জিয়াকে দেখে এসে তিনি সাংবাদিকদের জানান, "বেগম খালেদা জিয়ার জ্ঞান থাকলেও শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়... ম্যাডাম আমাদের চিনতে পেরেছেন। আমাদের সালামের রিপ্লাই দিয়েছেন। শি ইজ নট পারফেক্টলি অলরাইট (তিনি পরিপূর্ণভাবে সুস্থ নন)... হয়তো রিকভারি হতেও পারে, ইনশা আল্লাহ।"
অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন (ব্যক্তিগত চিকিৎসক): পূর্বে তিনি গণমাধ্যমকে অনুরোধ করেন, বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যেন কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য না ছড়ানো হয়। তিনি জানান, ম্যাডাম দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, "যেন তারা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।"
ড. মুহাম্মদ ইউনূস (প্রধান উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার): শুক্রবার (২৮ নভেম্বর, ২০২৫) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা। তাঁর সুস্বাস্থ্য দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" প্রধান উপদেষ্টা দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন এবং তাঁর চিকিৎসায় যেন কোনো ঘাটতি না থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রস্তুত বলে জানান।
অন্যদিকে, দলের পক্ষ থেকে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে পরিবার ও নেতাকর্মীদের প্রতি হাসপাতালে ভিড় না করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশবাসীর প্রার্থনা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভর করছে 'গণতন্ত্রের মা' হিসেবে পরিচিত এই নেত্রীর সুস্থ হয়ে ওঠা।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভস (১৯৭২-২০২৫ পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাবলী পর্যালোচনা)
বিএনপি অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ (২৮ নভেম্বর, ২০২৫)
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতি (২৮ নভেম্বর, ২০২৫)
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |