নাটোরের বড়াইগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষকতা করে আসা নন-এমপিও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। সহকর্মী প্রভাষক শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী মানিকের আত্মহত্যার ঘটনার পর নতুন করে সামনে এসেছে তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তা ও মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র। শিক্ষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও বেতন না পাওয়ায় অনেকেই ঋণ, সংসারের ব্যয় এবং আর্থিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কালিকাপুর-বনপাড়া কৃষি ও কারিগরি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক ছিলেন শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী মানিক। জীবিকার খরচ মেটাতে গিয়ে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজের বাড়ি-ভিটাও বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু তাতেও আর্থিক সংকট কাটেনি।
পরিবার ও জীবনের নানা চাপের মধ্যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে সোমবার সন্ধ্যায় ভাড়া বাসায় বিষাক্ত ট্যাবলেট সেবন করে আত্মহত্যা করেন তিনি।
সহকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন একই কলেজের অর্থনীতি বিষয়ের নন-এমপিও প্রভাষক সোহেল রানা। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষকদের জীবন এক কঠিন অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে গেছে।
তিনি জানান, প্রায় তিন বছর আগে একই কলেজের আরেক প্রভাষক মুক্তার হোসেন বেতন না পাওয়ার হতাশা নিয়ে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্ট্রোক করে মারা যান।
সোহেল রানার মতে, নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেও মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর বেতন না পাওয়ার কষ্ট কেবল ভুক্তভোগী শিক্ষকরাই উপলব্ধি করতে পারেন। বেতন হবে—এমন আশায় দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও যখন কোনো সমাধান আসে না, তখন তা তাঁদের মানসিক ও পারিবারিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের বড়াইগ্রাম উপজেলা সমন্বয়ক এবং আহম্মেদপুর ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক রসুল আলম জানান, উপজেলায় বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির বাইরে রয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত না হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
এসব প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে আড়াইশ শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ার কারণে উপজেলায় একটি মহিলা কলেজসহ পাঁচটি দাখিল মাদ্রাসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় আরও শতাধিক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
আহম্মেদপুর আযম আলী ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক আবুল কালাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর এলাকার শিক্ষার প্রসারে কাজ করার পাশাপাশি একটি সম্মানজনক ও স্বচ্ছল জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় এসেছিলেন।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ায় তাঁর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাঁর সঙ্গে পড়াশোনা করা অনেকেই ভালো চাকরি ও আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করলেও নন-এমপিও শিক্ষক হিসেবে তাঁদের জীবন নানা সংকটে আটকে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কলেজ শিক্ষক জানান, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে সন্তানদের ভালো পোশাক কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও অনেক সময় থাকে না। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়। ব্যক্তিগত ইচ্ছা কিংবা শখ পূরণের কথা ভাবার সুযোগও নেই।
তাঁর প্রত্যাশা, সরকার নন-এমপিও শিক্ষকদের দুরবস্থা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে তাঁদের এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে না হয়।
নন-এমপিও শিক্ষক আব্দুল বাতেন নিজের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, একজন দিনমজুরও দিন শেষে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা উপার্জন করতে পারেন। অথচ শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকায় তাঁরা চাইলেও সহজে দিনমজুরি কিংবা অন্য কোনো কাজে যেতে পারছেন না।
তিনি আরও বলেন, নিজের আয় না থাকলেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তাঁদের সংসার চালাতে হয়। দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা শুধু শিক্ষকদের ব্যক্তিগত জীবনকেই নয়, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্নকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রভাষক মানিকের আত্মহত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস।
তিনি বলেন, একজন কলেজ শিক্ষকের আত্মহত্যার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দেশের হাজার হাজার নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা দূর করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথাযথ উদ্যোগ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বড়াইগ্রামের প্রভাষক শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী মানিকের মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতার বাইরে থাকা শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত আড়াই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর জীবিকা এখনো অনিশ্চিত বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাঁদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত মানুষদের ন্যায্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |