| বঙ্গাব্দ

. হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন, জীবন বাঁচাতে জরুরি করণীয়

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 03-11-2026 ইং
  • 23010 বার পঠিত
. হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন, জীবন বাঁচাতে জরুরি করণীয়
ছবির ক্যাপশন: হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন, জীবন বাঁচাতে জরুরি করণীয়

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব সময় তীব্র বুকব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় গ্যাস, অ্যাসিডিটি কিংবা সাধারণ ক্লান্তি ভেবে উপসর্গগুলো উপেক্ষা করেন অনেকে। কিন্তু হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই হৃদপেশির ক্ষতি শুরু হতে পারে। তাই হার্ট অ্যাটাকের সামান্য সন্দেহ হলেও অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই শারীরিক পরিশ্রম বন্ধ করে জরুরি সহায়তা চাইতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে আরামদায়ক অবস্থায় বিশ্রামে রাখতে হবে এবং নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। চিকিৎসক বা জরুরি সেবাকর্মীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজন হলে অ্যাসপিরিন নেওয়া যেতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রথম পাঁচ মিনিটে করণীয়গুলো হলো—

প্রথম মিনিট: সব ধরনের কাজ বন্ধ করুন

বুকে চাপ, ব্যথা কিংবা হার্ট অ্যাটাকের অন্য কোনো লক্ষণ অনুভূত হলে সঙ্গে সঙ্গে চলমান কাজ বন্ধ করুন। হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম করা থেকে বিরত থাকুন।

দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করুন। নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। অ্যাম্বুলেন্সের প্রশিক্ষিত কর্মীরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় মিনিট: স্থির থাকুন এবং সাহায্য নিন

আতঙ্কিত না হয়ে পিঠে ভর দিয়ে আরামদায়ক অবস্থায় বসুন। আঁটসাঁট পোশাক ঢিলে করে দিন এবং অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া এড়িয়ে চলুন।

বাড়িতে একা থাকলে দরজার তালা খুলে রাখুন, যাতে জরুরি উদ্ধারকর্মীরা সহজে প্রবেশ করতে পারেন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী কিংবা কাছের কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকুন।

উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, সেই সময়টিও মনে রাখুন। চিকিৎসার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এ তথ্য কাজে লাগতে পারে।

চতুর্থ ও পঞ্চম মিনিট: চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাসপিরিন

হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে চিকিৎসক বা জরুরি সেবাকর্মীর পরামর্শে অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়া যেতে পারে। তবে সবার জন্য এই ওষুধ নিরাপদ নয়।

অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি, রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা কিংবা চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা থাকলে এটি গ্রহণ করা যাবে না।

যুক্তরাজ্যের এনএইচএস ও ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় ৩০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ACC/AHA নির্দেশিকায় অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোমের ক্ষেত্রে ১৬২ থেকে ৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

তবে মনে রাখতে হবে, অ্যাসপিরিন জরুরি চিকিৎসার বিকল্প নয়। ওষুধ খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে জরুরি সেবা ডাকতে দেরি করা যাবে না। ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাসপিরিন দেওয়া উচিত নয়।

হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণগুলো কী?

হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গ হলো বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী ভাব, আঁটসাঁট অনুভূতি কিংবা চেপে ধরার মতো ব্যথা। তবে এর বাইরেও বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

সাধারণ উপসর্গগুলো হলো—

  • বুকের ব্যথা বা চাপ বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পিঠে ছড়িয়ে পড়া।

  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।

  • অস্বাভাবিক ঠান্ডা ঘাম হওয়া।

  • বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়া।

  • মাথা ঘোরা বা হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া।

  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করা।

  • হঠাৎ বড় কোনো বিপদ ঘটতে যাচ্ছে, এমন তীব্র আশঙ্কা তৈরি হওয়া।

এসব লক্ষণের একাধিকটি একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ তুলনামূলক হালকা হলেও সেটি হার্ট অ্যাটাকের ইঙ্গিত হতে পারে।

সব হার্ট অ্যাটাকে কি বুকব্যথা হয়?

না। হার্ট অ্যাটাকের সময় সবার মধ্যে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বুকব্যথা ছাড়াও অন্যান্য উপসর্গ বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

এ ধরনের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—

  • শ্বাসকষ্ট।

  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা।

  • চোয়াল, পিঠ কিংবা পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি।

  • বমি বমি ভাব।

  • অসুস্থ বোধ করা বা মাথা ঘোরা।

অনেকে এসব সমস্যাকে গ্যাস বা অ্যাসিডিটি ভেবে অবহেলা করেন। ফলে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয়। তাই উপসর্গের ধরন স্পষ্ট না হলেও হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় দেরি হওয়ার চিত্র গবেষণায়

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় ২০২১ সালে জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে।

দিল্লির একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪৭ জন STEMI রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, বুকে ব্যথা শুরু হওয়ার পর হাসপাতালে পৌঁছাতে রোগীদের গড়ে ৪ দশমিক ৭ ঘণ্টা সময় লেগেছিল।

গবেষণার উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলো হলো—

  • মাত্র ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন।

  • অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে হাসপাতালে এসেছিলেন মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ রোগী।

  • হাসপাতালে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগায় জরুরি চিকিৎসা শুরুর ক্ষেত্রেও বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়।

এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হয়ে গেলে কী করবেন?

হার্ট অ্যাটাকের পর কেউ অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে সেটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ হতে পারে। এটি অত্যন্ত জরুরি অবস্থা।

এমন পরিস্থিতিতে করণীয়—

1. দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবায় ফোন করুন এবং আশপাশের কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকুন।

2. আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না পরীক্ষা করুন। হাঁপানোর মতো অনিয়মিত শ্বাসকে স্বাভাবিক শ্বাস হিসেবে বিবেচনা করবেন না।

3. স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে অবিলম্বে সিপিআর (CPR) শুরু করুন।

4. বুকের ঠিক মাঝখানে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার জোরে ও দ্রুত চাপ দিন।

5. আশপাশে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) থাকলে কাউকে সেটি নিয়ে আসতে বলুন এবং যন্ত্রের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা পৌঁছানো পর্যন্ত সিপিআর চালিয়ে যেতে হবে। প্রশিক্ষণ না থাকলেও জরুরি সেবাকর্মীর নির্দেশনা অনুযায়ী বুকের ওপর চাপ দেওয়া শুরু করা যেতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের সময় যেসব ভুল করবেন না

জীবনঝুঁকিপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত বিপদ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এ ধরনের কাজ এড়িয়ে চলা জরুরি—

  • ব্যথা নিজে থেকেই কমে যাবে ভেবে অপেক্ষা করা।

  • নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করা।

  • ঘুমিয়ে পড়ে উপসর্গ কমার অপেক্ষা করা।

  • গ্যাস বা অ্যাসিডিটির ওষুধ খেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা।

  • গরম পানীয় পান, মালিশ কিংবা ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা।

  • অন্যের জন্য নির্ধারিত ওষুধ গ্রহণ করা।

  • তথাকথিত ‘কাফ সিপিআর’ পদ্ধতিতে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসার চেষ্টা করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জরুরি চিকিৎসা নিতে কোনো ধরনের বিলম্ব করা যাবে না।

হার্ট অ্যাটাক হলে দ্রুত চিকিৎসা কেন প্রয়োজন?

হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধলে রক্ত চলাচল আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে হৃদপেশির একটি অংশ প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পায় না। রক্ত সরবরাহ বন্ধ থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আক্রান্ত অংশের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

চিকিৎসা পেতে যত দেরি হয়, হৃদপেশির ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়ে। এ কারণে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দ্রুত ইসিজি (ECG) এবং প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করা হয়।

রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধের ওষুধ দিতে পারেন। প্রয়োজনে এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনি খুলে স্টেন্ট স্থাপন করা হয়।

দ্রুত চিকিৎসা পেলে হৃদপেশির স্থায়ী ক্ষতি, হার্ট ফেইলিওর এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

উপসংহার

হার্ট অ্যাটাক এমন একটি জরুরি স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুকব্যথা না থাকলেও শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঠান্ডা ঘাম কিংবা চোয়াল-পিঠে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই গ্যাস বা অ্যাসিডিটি ভেবে এসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়। হার্ট অ্যাটাকের সামান্য সন্দেহ হলেই দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করাই জীবন রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency