দুই হাত নেই, পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে জিপিএ-৩.৫০ পেলেন রংপুরের অদম্য কলি রানী
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। বাবাকেও হারিয়েছেন ছোটবেলায়। কিন্তু চরম দারিদ্র্য, শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও হাজারো প্রতিকূলতা কোনো কিছুই দমাতে পারেনি রংপুরের কাউনিয়ার অদম্য মেধাবী কলি রানীকে (১৮)। ডান পা দিয়েই পরীক্ষার খাতায় লিখে চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৩.৫০ অর্জন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। এখন তাঁর সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন—উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করা।
জানা গেছে, চলতি বছর কাউনিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন কলি রানী।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নিভৃত পল্লী হরিশ্বর গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের মেয়ে কলি রানী। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। অতিদরিদ্র ও বাবা-হারা এই পরিবারের হাল ধরতে এবং ছোট মেয়ের পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে তাঁকে প্রথমে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন তাঁর বড় ভাই মন্টু রাম রায়। অভাব-অনটনের মাঝেও হার না মেনে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে সাহস জুগিয়ে গেছেন মা রূপালী রানী।
অদম্য লড়াইয়ের গল্প ও বহুমুখী প্রতিভা
স্থানীয়রা জানান, কলি রানীর জীবনের পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকা এবং প্রায় চার ফুট উচ্চতার এই কিশোরীকে হাঁটাচলা করতেও নানা লড়াই করতে হয়। তবে তাঁর পড়াশোনার অদম্য জেদ সব বাধাকে তুচ্ছ করেছে। এর আগে ডান পা দিয়েই লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও এসএসসি পরীক্ষাতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি।
শুধু পড়াশোনাতেই নয়, কলি রানীর রয়েছে চমৎকার বহুমুখী প্রতিভা। ডান পা দিয়েই তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারেন। পাশাপাশি সঙ্গী হিসেবে রয়েছে সংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে ইতিমধ্যে তিনি একাধিক পুরস্কার ও প্রশংসাও অর্জন করেছেন।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
নিজের অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের কথা জানিয়ে কলি রানী বলেন, “আমার স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দেশ ও সমাজের সেবা করতে চাই। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে পরিবারের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষের সব বাধা-বিপত্তিকে পেছনে ফেলে আমি আমার ইচ্ছাশক্তি দিয়েই এ পর্যন্ত এসেছি। আমাকে দেখে যেন অন্য প্রতিবন্ধী ভাই-বোনেরাও তাদের জীবনের সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে।”
কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, বোর্ডের নিয়মানুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বিশেষ কক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও কলি রানী সবার সঙ্গে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের মতোই একসঙ্গে বসে পরীক্ষা দেওয়ার জোরালো ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ীই ৩০২ নম্বর কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে প্রতিটি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আজম বলেন, “কলি রানী পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে জিপিএ-৩.৫০ অর্জন করায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে মানুষের স্বপ্নপূরণের পথে কখনো বাধা হতে পারে না, কলি তা প্রমাণ করে দিয়েছে। আমরা তাঁর সর্বাঙ্গীন সফলতা কামনা করি।”
বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আনছার আলী বলেন, “ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে সব কিছু জয় করা যায়, কলি রানী তারই উজ্জ্বল প্রমাণ। শত প্রতিকূলতা জয় করে সে এইচএসসি পাস করেছে এবং ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আমরা তার এই মহৎ ইচ্ছার পূর্ণ সফলতা কামনা করি।”