প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
অফিস-আদালতের কাজের প্রচণ্ড ব্যস্ততা, দীর্ঘ যানজট কিংবা রাস্তায় যাতায়াতের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শৌচালয়ের (টয়লেট) তীব্র অভাব—নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি ও অভ্যাসের কারণে আমরা অনেকেই অনেক সময় প্রস্রাব চেপে বা আটকে রাখি। কিন্তু আপনি কি জানেন, সাময়িক এই অভ্যাসের পরিণাম হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ ও জীবনঘাতী? চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখার এই অভ্যাস শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, একজন সুস্থ ও পূর্ণবয়স্ক মানুষের মূত্রাশয় সাধারণত ৩৫০ থেকে ৫৫০ মিলিলিটার পর্যন্ত মূত্র ধরে রাখতে সক্ষম। তবে মূত্রথলিতে যখন প্রায় ২০০ মিলিলিটার পরিমাণ মূত্র জমা হয়, তখনই মস্তিষ্কে মূত্র ত্যাগের প্রাকৃতিক প্রয়োজন অনুভূত হয়। কিন্তু নানা অজুহাতে এই প্রাকৃতিক তাগিদকে দীর্ঘক্ষণ অবহেলা করা বা চেপে রাখা শরীরের স্বাস্থ্যের জন্য কোনোভাবেই ভালো নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষতিকর অভ্যাসের চর্চা করলে শরীরে মারাত্মক কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্রস্রাব চেপে রাখার যত ভয়াবহ ক্ষতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি:
১. কিডনি স্টোন ও কিডনি নষ্টের ঝুঁকি: মূত্রের প্রধান কাজ হলো শরীরের বিভিন্ন দূষিত ও বর্জ্য পদার্থকে মূত্রনালীর মাধ্যমে দেহের বাইরে বের করে দেওয়া। প্রস্রাবের সঙ্গে ইউরিয়া এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো বেশ কিছু টক্সিক বা বিষাক্ত পদার্থ শরীর থেকে বের হয়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখলে এই বিষাক্ত পদার্থগুলো আবার উল্টো পথে কিডনিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। এর ফলে কিডনিতে স্টোন বা পাথর জমার মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিডনিতে পাথর সৃষ্টি হলে তীব্র ব্যথা, মারাত্মক সংক্রমণ কিংবা রক্তপাতের মতো জটিলতা দেখা দেয়। পাথরের আকার বড় হলে তা অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে কিডনি পুরোপুরি কার্যক্ষমতা হারিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
২. পেলভিক ফ্লোরের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া: দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত প্রস্রাব আটকে রাখলে শ্রোণিতল বা পেলভিক ফ্লোরের (Pelvic Floor) পেশিগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে ভবিষ্যতে নিজের অজান্তেই প্রস্রাব ধরে রাখতে বড় ধরনের অসুবিধা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় হাঁচি, কাশি কিংবা হাসির সময়ও অনিচ্ছাকৃতভাবে সামান্য প্রস্রাব ঝরে পড়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া দেখা দেয় ঘন ঘন বা বারবার মূত্রত্যাগের তীব্র প্রবণতা।
৩. মূত্রনালীর সংক্রমণ (ইউটিআই): বেশিক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখলে মানবদেহের মূত্রনালীতে ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ব্লাডারে বা মূত্রথলিতে জীবাণুরা বংশবিস্তার করতে থাকে, যা থেকে পরবর্তীতে সংক্রামক রোগ ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই (UTI)-এর মতো কষ্টদায়ক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি মূত্রথলি অতিরিক্ত ফুলে যাওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে প্রস্রাব করার সময় প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া ও ব্যথা অনুভব হতে পারে।
৪. মূত্রাশয়ের স্থায়ী প্রসারণ ও দুর্বলতা: স্বাভাবিক অবস্থায় মূত্রাশয় যখন পূর্ণ থাকে, তখন তা প্রসারিত হয় এবং মূত্র ত্যাগের পর তা আবার নিজের পূর্বের আকারে ফিরে আসে। কিন্তু ক্রমাগত বা নিয়মিত প্রস্রাব আটকে রাখার কারণে মূত্রাশয়ের পেশিগুলোর স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে একপর্যায়ে মূত্রাশয় আর নিজের স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসতে পারে না এবং স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
৫. মূত্রাশয় ফেটে যাওয়ার মতো মারাত্মক দুর্ঘটনা: যদিও এই ঘটনাটি কিছুটা বিরল, তবুও অতিরিক্ত সময় ধরে মূত্রথলিতে প্রস্রাব আটকে রাখার কারণে প্রেশার বেড়ে গিয়ে মূত্রাশয় ফেটে যাওয়ার মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমন দুর্ঘটনা ঘটলে রোগীর জীবন বাঁচাতে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।
পরিশেষে, সুস্থ ও সচল কিডনি এবং শরীর ঠিক রাখতে যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি, ঠিক তেমনি সময়মতো প্রাকৃতিক বেগ বা মূত্র ত্যাগ করাও সমানভাবে অপরিহার্য। তাই সামান্য অবহেলা বা ব্যস্ততার অজুহাতে আর কখনোই প্রস্রাব চেপে রাখবেন না।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |