প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালে পাঁচজন অসহায় নাবালিকাকে ধারাবাহিক গণধর্ষণ ও ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের অভিযোগে করা আলোচিত এক মামলায় স্থানীয় একটি দৈনিক সংবাদপত্রের মালিক পেয়ার মিয়াঁকে ১০ দফায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি বিশেষ আদালত। সাজাপ্রাপ্ত ৭৮ বছর বয়সী এই আসামিকে অতিরিক্ত ৭৭ লাখ ৬৪ হাজার রুপি আর্থিক জরিমানাও করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই একই মামলায় এক চিকিৎসকসহ পেয়ার মিয়াঁর চার সক্রিয় সহযোগীকেও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ পকসো (POCSO) আদালতের বিজ্ঞ বিচারক কুমুদিনী সিং এক ঐতিহাসিক রায়ে এই আদেশ দেন। সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের মধ্যে পেয়ার মিয়াঁর প্রধান সহযোগী রাবিয়া বিবিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নাবালিকাদের ওপর যৌন নিপীড়নে সহায়তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ওবায়েস নামের আরেক সহযোগীকে পৃথক মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সুইটি বিশ্বকর্মা নামের অপর সহযোগীকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া নাবালিকাদের জোরপূর্বক গর্ভপাত করাতে সহায়তা করার গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. হেমন্ত মিত্তলকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'হিন্দুস্তান টাইমস'-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, আদালতের দেওয়া রায়ে পেয়ার মিয়াঁর আটটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কারাগারেই সাজা ভোগ করতে হবে। বাকি দুটি দণ্ডও আমৃত্যু যাবজ্জীবন। উল্লেখ্য, অসহায় নাবালিকাদের যৌন নিপীড়নের একই ধরনের ভয়াবহ অপরাধে ইতিপূর্বেও আরও চারটি পৃথক মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন পেয়ার মিয়াঁ।
যেভাবে পাতা হতো প্রতারণার ফাঁদ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পি এন সিং রাজপুত আদালতকে জানান, ২০১৪ সাল থেকে ভোপালের চরম দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের নাবালিকা মেয়েদের সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য বানাতেন পেয়ার মিয়াঁ। তাদের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ দেওয়া এবং মাসে ১০ হাজার রুপি বেতনের বড় প্রলোভন দেখিয়ে কাছে টানা হতো। পেয়ার মিয়াঁর সহযোগী রাবিয়া বিবি মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে ওই সব নাবালিকা মেয়েকে কৌশলে তাঁর কাছে নিয়ে যেতেন। এরপর সুযোগ বুঝে বিভিন্ন সময়ে ও গোপন আস্তানায় নিয়ে তাদের ওপর পাশবিক যৌন নির্যাতন চালানো হতো।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও প্রকাশ করেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সরলতার সুযোগ নিয়ে গভীর আস্থা অর্জনের জন্য পেয়ার মিয়াঁ নিজেকে 'আব্বু' বা বাবা হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং মেয়েদেরও তাকে 'আব্বু' বলে ডাকতে বাধ্য করতেন। পরিবারগুলোর বিশ্বাস অর্জনে তিনি প্রায়শই তাদের বাসায় যেতেন এবং তাদের বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিতেন।
জন্মদিনের পার্টির প্রলোভনে উদ্ধার ও মামলার সূত্রপাত ঘটনার ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয় ২০২০ সালের ১১ জুলাই। ওই দিন ভোপালের রাতিবাদ এলাকা থেকে চরম নেশাগ্রস্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় কয়েকজন নাবালিকা মেয়েকে উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। পরবর্তীতে তাদের মানসিক চিকিৎসার সময় পেশাদার কাউন্সিলিংয়ে তারা স্বীকার করে যে, একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে জন্মদিনের বর্ণাঢ্য পার্টি উদযাপনের কথা বলে ডেকে নিয়ে তাদের দুই দিন ধরে আটকে রাখা হয়। সেখানে জোরপূর্বক মাত্রাতিরিক্ত মদ পান করানোর পর তাদের ওপর বিভৎস যৌন নিপীড়ন চালানো হয়।
ঘটনার পরপরই ওই ফ্ল্যাটে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মদের বোতলসহ আলামত উদ্ধার করে পুলিশ। মামলা দায়েরের মাত্র নয় দিনের মাথায় কাশ্মীর সীমান্ত সংলগ্ন শ্রীনগর থেকে মূল অভিযুক্ত পেয়ার মিয়াঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আর্থিক অনিয়ম ও দখলদারির সাম্রাজ্য নাবালিকা নিপীড়নের পাশাপাশি পেয়ার মিয়াঁ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও ভুয়া দখলের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ভোপালের অভিজাত আনসাল অ্যাপার্টমেন্টে একটি মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করে প্রাপ্ত মোটা অঙ্কের ভাড়ার অর্থ বেআইনিভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিতে তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে একটি ভুয়া সমিতি গঠনের পৃথক অভিযোগও রয়েছে।
পেশাগত জীবনে একজন সাধারণ মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন পেয়ার মিয়াঁ। পরবর্তীতে ক্ষমতার প্রভাবে তিনি স্থানীয় ভাষার একটি দৈনিক পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ও মালিক বনে যান। নিজের সংবাদপত্র মালিকানার প্রভাব খাটিয়ে ভোপালের ঐতিহ্যবাহী বুঢ়ওয়ারা এলাকার হাতিখানা অঞ্চলে তাকে একটি সরকারি বাসভবনও অবৈধভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ভোপালজুড়ে অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি জমি ও স্থাবর সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ রয়েছে এই কুখ্যাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |