প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
আগামীতে শুধু একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করাই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একমাত্র লক্ষ্য নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতিটি নির্বাচনে একই উচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখার একটি সুদৃঢ় ও টেকসই সংস্কৃতি দেশে প্রতিষ্ঠা করাই কমিশনের মূল ব্রত। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এ কথাগুলো স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
সিইসি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে ন্যূনতম মানদণ্ড ইতোমধ্যে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা শুধু ধরে রাখাই নয়; বরং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও উৎসবমুখর নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাবে।
নির্বাচনব্যবস্থাকে সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় সাক্ষাৎকারে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, “শুধু একটা ভালো নির্বাচন করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। ভবিষ্যতে যাতে দেশের সব নির্বাচন ঠিক ওই একই মানের ও স্বচ্ছতার হয়, সেই স্থায়ী ব্যবস্থা ও প্রচেষ্টা আমাদের গড়ে তুলতে হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনব্যবস্থা কোনো এককালীন বা বিচ্ছিন্ন কোনো আয়োজন নয়। একটি ভালো নির্বাচন শেষ হলেই কমিশনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং দেশে একটি ভালো নির্বাচনের স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি।
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন প্রসঙ্গে সিইসি জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্জিত চমৎকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও একই বা তার চেয়েও উন্নত মানদণ্ডে সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের আন্তরিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি জোর দেন।
চাপমুক্ত পরিবেশে কাজ করছে ইসি ও নভেম্বরে রাজনৈতিক সংলাপ একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের কোনো ধরনের আপস নেই জানিয়ে সিইসি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “আমাদের কমিটমেন্টের মধ্যে কোনো খাদ নেই।” কমিশনের ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মহলের পক্ষ থেকে বাড়তি কোনো চাপ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতার কথা তুলে ধরে সিইসি জানান, আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যেই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসার জোর প্রস্তুতি রয়েছে কমিশনের। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থীদের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অদৃশ্য বা প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকতে পারে। তাই নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ইউপি নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা ও আচরণবিধিতে কঠোর অবস্থান আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান সিইসি। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আইনগতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ও আদালতের নির্দেশনার আওতায় থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বিবেচনা করে প্রতি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা ও সংঘাতের ইতিহাস উল্লেখ করে সিইসি সতর্ক করেন যে, ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা রোধ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে:
সিসি ক্যামেরা ও বডি ওর্ন ক্যামেরা: প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বাধ্যতামূলকভাবে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের শরীরেও আধুনিক ক্যামেরা সংযুক্ত থাকবে, যাতে যেকোনো অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার দৃশ্য সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ড হয়ে থাকে।
কঠোর আচরণবিধি বাস্তবায়ন: নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নে এবার কমিশনের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে এবং কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর মানুষের মনে নির্বাচন ব্যবস্থা ও ইসি নিয়ে যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা নিরসন করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানান সিইসি। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ভো타ধিকার প্রয়োগ ও নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে কমিশন ভোটার তালিকা নির্ভুল করার কাজে হাত দেয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় ৭৭ হাজার কর্মীর পরিশ্রমে প্রায় ১০ লাখ নতুন নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে ২১ লাখেরও বেশি মৃত ভোটারের নাম নির্ভুলভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সিইসি বলেন, সাংবাদিকদের জন্য নির্বাচন কমিশনের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সংবাদকর্মীরা যেন কোনো বাধা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে অবাধে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সহজ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
অভিযোগ প্রতিকার এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সীমা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনিয়ম ও প্রার্থীর অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির সমন্বয়ে কার্যকর বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে কালো টাকার প্রভাব ও ভোট কেনাবেচা রোধে কড়া নজরদারি রাখা হবে বলে জানান তিনি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে দেশের সমস্ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে আগামী ১০ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা দেন সিইসি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এই বড় কর্মযজ্ঞ শুরু হচ্ছে এবং ধাপে ধাপে পৌরসদাসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা হবে।
নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ ও তরুণ ভোটারদের সুযোগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোকে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে সিইসি বলেন, পরিবার ও সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণার কারণে অনেক নারী প্রার্থী হতে উৎসাহ পান না। এই অবস্থার পরিবর্তনে কেবল নির্বাচন কমিশন একা নয়, রাজনৈতিক দলসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া তরুণ ভোটারদের উৎসাহিত করতে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তাদের ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়ার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা এবারের নির্বাচনকে আরও বেশি অংশগ্রহণমূলক ও তরতাজা করে তুলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরিশেষে, দলমত নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই একটি আদর্শ, মানসম্মত ও উৎসবমুখর স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশবাসীকে উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |