| বঙ্গাব্দ

মুসলিম যে নারীর হাত ধরে গড়ে উঠেছিল ‘বিশ্বের প্রাচীনতম’ বিশ্ববিদ্যালয়

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 03-10-2026 ইং
  • 9741 বার পঠিত
মুসলিম যে নারীর হাত ধরে গড়ে উঠেছিল ‘বিশ্বের প্রাচীনতম’ বিশ্ববিদ্যালয়
ছবির ক্যাপশন: মুসলিম যে নারীর হাত ধরে গড়ে উঠেছিল

বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় আল কারাউইয়্যিন: মুসলিম নারী ফাতিমা আল-ফিহরির অমর সৃষ্টি

প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কোর প্রাচীন পাহাড়ি শহর ফেজ। এই শহরের সরু ও আঁকাবাঁকা গলিতে এখনো ইঞ্জিনচালিত কোনো গাড়ি চলাচল করে না। শহরের কেন্দ্রের দিকে তাকালে চোখে পড়ে মনোরম সবুজ সিরামিক টালির ছাদ। আর এসব ছাদের নিচেই শত শত বছর ধরে অবিরাম জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে ঐতিহাসিক আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউনেস্কো এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি অনুযায়ী, ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আল কারাউইয়্যিন হলো বর্তমানে চালু থাকা বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় এর দুই শতাব্দীরও বেশি পরে, ১০৮৮ সালে। এমনকি অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আরও অনেক পরে।

তবে এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় এবং গৌরবের দিক হলো, এটি কোনো রাজা বা পুরুষ শাসক নন, বরং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন দূরদর্শী মুসলিম নারী—ফাতিমা আল-ফিহরি।

ফাতিমা আল-ফিহরি কে ছিলেন?

ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের চতুর্দশ শতাব্দীর গ্রন্থ ‘রাওয আল-কিরতাস’-এ ফাতিমা আল-ফিহরি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। তিনি ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের উত্তরসূরি। তাঁর পরিবার ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের যাতায়াত ছিল।

আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে জন্ম নেন ফাতিমা। তাঁর পুরো নাম ছিল ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-ফিহরি আল-কুরাইশিয়া। ব্যবসায়িক কারণে তাঁর বাবা মুহাম্মাদ আল-ফিহরি পরিবার নিয়ে মরক্কোয় চলে যান এবং ফেজ শহরে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে ব্যবসায় ব্যাপক সাফল্য পেয়ে তিনি ধনী হয়ে ওঠেন। পারিবারিক পরিবেশেই ফাতিমা ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি কোরআন-হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।

বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী হারানোর পাশাপাশি তিনি বাবা ও ভাইকেও হারান। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পদের মালিক হন ফাতিমা ও তাঁর বোন মারিয়াম আল-ফিহরি।

সম্পদ দিয়ে মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সেই বিপুল সম্পদ বিলাসবহুল জীবনে ওড়ানোর পরিবর্তে মানবকল্যাণে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন দুই বোন। মারিয়াম তাঁর সম্পদের বড় অংশ দিয়ে নির্মাণ করেন ‘আল আন্দালুস মসজিদ’।

আর ফাতিমা নিজের সমস্ত সম্পদ দিয়ে নির্মাণ করেন একটি বিশাল মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র। ইতিহাসবিদদের মতে, ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ১ রমজান এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। দুই বছরের মধ্যে মূল ভবন নির্মিত হলেও পুরো কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হতে বহু বছর লেগেছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, ফাতিমা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই নির্মাণকাজ তদারক করতেন। নির্মাণ শেষে নিজের জন্মস্থান তিউনিসিয়ার কাইরুয়ানের নামানুসারে এর নাম দেওয়া হয় ‘আল কারাউইয়্যিন’।

মসজিদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর

প্রতিষ্ঠার শুরুতে আল কারাউইয়্যিন মূলত মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভাষাবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, আইন, গণিত, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো বহুমুখী বিষয়ে শিক্ষাদান শুরু হয়। মধ্যযুগে কেবল মুসলিমরাই নন, বরং ইহুদি ও খ্রিস্টান শিক্ষার্থীরাও এখানে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন, মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি ও জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজির মতো বিশ্বখ্যাত মনীষীরা বিভিন্ন সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মরক্কোর ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আল-মানুনির মতে, আনুমানিক ১০৪০ থেকে ১১৪৭ সালের মধ্যে আল কারাউইয়্যিন উচ্চশিক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয় এবং শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়।

সমৃদ্ধ ও দুর্লভ গ্রন্থাগার

আল কারাউইয়্যিন কমপ্লেক্সের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রাচীন গ্রন্থাগার। ১৩৫৯ সালে মারিনিড রাজবংশের আমলে এটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। এই লাইব্রেরিতে মধ্যযুগের ২০ হাজারের বেশি হাতে লেখা বই ও প্রায় চার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ইমাম মালিক ইবনে আনাসের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুওয়াত্তা’

  • ইবনে ইসহাকের সংকলিত মহানবী (সা.)-এর জীবনী

  • ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমাহ’ ও ‘আল-ইবার’-এর মূল পাণ্ডুলিপি

  • পবিত্র কোরআনের একটি প্রাচীন দুর্লভ পাণ্ডুলিপি

১৯৬৩ সালে রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে আল কারাউইয়্যিনকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৬৫ সালে এর নামের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি যুক্ত করা হয়। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও ফেজ শহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা আল কারাউইয়্যিন শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা, সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক অমর স্মারক।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency