আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষণ
৭ আগস্ট, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের মধ্যকার চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈরিতা নতুন মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্প ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেছেন যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে তেহরান অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণাপূর্ণ আচরণ করছে। তবে দীর্ঘদিনের ইতিহাস বলছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে বুঝতে ব্যর্থ হওয়ার তালিকায় ট্রাম্প একা নন; বরং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে হোয়াইট হাউসের প্রায় প্রতিটি প্রশাসনই তেহরানের এই রহস্যময় ক্ষমতার কাঠামো ও রাজনৈতিক মানসিকতার কাছে হোঁচট খেয়েছে।
ট্রাম্পের ক্ষোভ: ট্রাম্প নিজেকে প্রতিপক্ষ মূল্যায়নে ওস্তাদ মনে করলেও ইরানের নেতারা তাকে বোকা বানিয়েছেন এবং চুক্তি নিয়ে তাকে চরম হতাশায় ফেলেছেন।
হরমুজ প্রণালি সংকট: হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প ও ইরানের টানাপোড়েন চলছে, যেখানে তেহরান টোল আদায়ের দাবিতে অনড়।
ঐতিহাসিক ব্যর্থতা: কার্টার, রিগান, ক্লিনটন থেকে শুরু করে ট্রাম্প পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর নাগাল পেতে বারবার হিমশিম খেয়েছেন।
একমাত্র ব্যতিক্রম: একমাত্র বারাক ওবামা প্রশাসনের সময়ে ২০ মাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইরান পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: সিআইএ-র সাবেক বিশ্লেষক কেনেথ পোলক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সুজান ম্যালোনির মতে, মার্কিন নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ ইরানি নেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের চরম অভাবই এই ব্যবধান তৈরি করেছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিমান হামলায় দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর পর ট্রাম্প আশা করেছিলেন ইরানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং তিনি নিজের পছন্দমতো নেতা বসাতে পারবেন। কিন্তু তেহরানের কট্টরপন্থি রাজনৈতিক ব্যবস্থা সেই আশাকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেয়, যিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি অনমনীয়।
সিআইএ-এর সাবেক বিশ্লেষক ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলক মন্তব্য করেছেন, "ট্রাম্প হয়তো সেই প্রেসিডেন্ট যিনি ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝেছেন।" ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করার স্পষ্ট তাড়াহুড়ো এবং দ্রুত ফল পাওয়ার মানসিকতাকে ইরান তাদের দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বনাম ইরান: চার দশকের কূটনৈতিক ধাঁধা:
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ • জিমি কার্টার (১৯৮০) : জিম্মি সংকট নিরসনে গোপন আলোচনা করেও খোমেনির কাছে ব্যর্থ।│
│ • রোনাল্ড রিগান (১৯৮৫): অস্ত্র বিক্রি ও মধ্যপন্থিদের আকৃষ্টের চেষ্টা 'ইরান-কন্ট্রা' কেলেঙ্কারিতে রূপ নেয়।│
│ • বিল ক্লিনটন (১৯৯৭) : সংস্কারপন্থি খাতামির সঙ্গে বরফ গলানোর চেষ্টা খামেনির বিরোধিতায় ভেস্তে যায়।│
│ • বারাক ওবামা (২০১৫) : ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি সাক্ষরে সফল হলেও ট্রাম্প পরবর্তীতে তা বাতিল করেন।│
│ • ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০২৬): সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ ও সরাসরি সমঝোতার চেষ্টায় চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশা।│
└─────────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বসূরিরাও একইভাবে ইরানের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিয়েছেন:
১. জিমি কার্টার (১৯৮০): ৫২ জন আমেরিকান জিম্মি মুক্ত করতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গোপন আলোচনা চালালেও শেষ মুহূর্তে আয়াতুল্লাহ খোমেনি সেই প্রস্তাব বাতিল করে দেন।
২. রোনাল্ড রিগান (১৯৮৫): মধ্যপন্থি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের আশায় লেবাননে বন্দি জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে গোপনে অস্ত্র বিক্রি করতে গিয়ে ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’র মুখে পড়েন।
৩. বিল ক্লিনটন (১৯৯৭): সংস্কারপন্থি মোহাম্মদ খাতামির সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের ঐতিহাসিক সুযোগ এলেও খামেনি ওয়াশিংটনের সেই সদিচ্ছা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।
৪. বারাক ওবামা (২০১৫): একমাত্র ওবামার আমলেই ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে এককভাবে বেরিয়ে এসে চরম অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক পরিচালক সুজান ম্যালোনি উল্লেখ করেছেন, শীর্ষ ইরানি নেতাদের সঙ্গে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সরাসরি যোগাযোগের চরম অভাব এবং তেহরানের আদর্শিক প্রতিশ্রুতিকে অবমূল্যায়ন করাই যুক্তরাষ্ট্রের বারবার ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ। মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতির অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ডেনিস রস-এর মতে, "মনে হয় আমরা তাদের যতটা বুঝি, ইরানিরা আমাদের তার চেয়ে অনেক ভালো বোঝে।"
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |