| বঙ্গাব্দ

বাড়ি ফেরার সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট | ফ্রান্স বনাম স্পেন সেমিফাইনাল

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 13-07-2026 ইং
  • 21782 বার পঠিত
বাড়ি ফেরার সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট | ফ্রান্স বনাম স্পেন সেমিফাইনাল
ছবির ক্যাপশন: ফ্রান্স বনাম স্পেন সেমিফাইনাল

এমবাপ্পে নাকি ইয়ামাল—কার জন্য অপেক্ষা করছে বিদায়ের সেই দীর্ঘতম আকাশযাত্রা?

বিশ্বকাপ বিশেষ কলাম | ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬

সর্বশেষ আপডেট: ১৩ জুলাই, ২০২৬ | বিকেল ০৩:২৩

শেষ বাঁশি বাজবে। রেফারি হাত উঁচিয়ে জানিয়ে দেবেন সময় শেষ। একজন জিতবেন, একজন হারবেন। একজনের বিশ্বকাপ বেঁচে থাকবে, অন্যজনের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে ঠিক সেখানেই।

ফ্রান্স কিংবা স্পেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা লামিন ইয়ামাল। সেমিফাইনালের এই মহাদ্বৈরথ শেষে একজনের চোখে থাকবে আরও বড় ফাইনালের স্বপ্ন। আর অন্যজনের সামনে অপেক্ষা করবে বাড়ি ফেরার সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে ভারী এক ফ্লাইট।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়টা আদতে মাঠেই নিশ্চিত হয়, তবে পরাজয়ের আসল মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা শুরু হয় স্টেডিয়াম থেকে বিমানবন্দরের পথে। স্কোরবোর্ডে তখনও জ্বলজ্বল করতে থাকবে নিষ্ঠুর ফলাফলটি। বিজয়ীরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে উৎসবে মাতবেন। গ্যালারির এক পাশে যখন ঢাক-ঢোলের গর্জন, অন্য পাশে তখন ভর করবে শ্মশানের নীরবতা। কেউ মাথায় হাত দিয়ে সবুজ ঘাসেই বসে পড়বেন, কেউ জার্সি দিয়ে মুখ ঢাকবেন কান্না লুকাতে, কেউ বা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন মাঠের দিকে।

গতি আর কিশোর কবির স্বপ্নভঙ্গের উপাখ্যান

হয়ত ফ্রান্স হারবে। এমবাপ্পে দাঁড়িয়ে থাকবেন কিছুক্ষণ। যে মানুষটির অতিমানবীয় গতির সঙ্গে ছুটেছে একটি দেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন, তিনিই হয়ত সেদিন সবচেয়ে ধীর পায়ে, মাথা নিচু করে হাঁটবেন ড্রেসিংরুমের দিকে।

অথবা হারবে স্পেন। ১৭ বছর বয়সি কিশোর লামিন ইয়ামাল মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়বেন। যে কিশোরের জাদুকরী বাঁ পায়ে একটি পুরো দেশ নতুন ফুটবল যুগের স্বপ্ন দেখেছে, তাকেও সেদিন কঠিন ফুটবল বাস্তবতায় বুঝতে হবে—বিশ্বকাপ শুধু নায়ক তৈরি করে না, এটি নির্মমভাবে হৃদয়ও ভাঙে।

তারপর ড্রেসিংরুমের সেই চেনা অথচ দমবন্ধ পরিবেশ। কেউ কোনো কথা বলবেন না। কারও বুট তখনও পায়ে জড়ানো। কেউ মাথা নিচু করে শুধু মেঝেতে তাকিয়ে থাকবেন। কোচ সান্ত্বনা দিতে হয়ত কিছু বলবেন, কিন্তু সব কথা কি তখন অবশ হয়ে যাওয়া কানে পৌঁছায়?

হোটেলের ঘর থেকে রানওয়ের শূন্যতা

ম্যাচ শেষে হোটেলে ফিরবেন ফুটবলাররা। ঘরের টেবিলে পড়ে থাকবে বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বা পরিচয়পত্র, ম্যাচের রণকৌশলের কাগজ, আধখাওয়া পানির বোতল। ব্যাগে অত্যন্ত যত্ন করে ভাঁজ করে রাখা হবে জাতীয় দলের জার্সিটি। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে জার্সিটি একটি দেশের ১৬ আনা স্বপ্ন বহন করছিল, সেটিই তখন এক নিমিষে রূপ নেবে এক অসমাপ্ত গল্পের যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিতে।

✈️ মানচিত্রে যে দূরত্ব কয়েক ঘণ্টার, 
হৃদয়ের ক্যানভাসে তা এক যুগের সমান।
সেটিই বিশ্বকাপের সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট।

পরদিন বিমানবন্দর। লাগেজ চলে যাবে বিমানের পেটে। ফুটবলাররা এসে বসবেন নিজেদের প্রথম শ্রেণীর আসনে। কিন্তু কেউ কি সত্যিই তখন স্বদেশে ফিরতে চাইবেন? বিমান যখন রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উড়াল দেবে, নিচে ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে সেই চেনা স্টেডিয়াম ও দেশ, যেখানে তারা এসেছিলেন বিশ্বজয়ের অদম্য বাসনা নিয়ে। জানালার পাশে বসে কেউ মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকবেন, কেউ হেডফোন কানে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ভুলে থাকতে চাইবেন বাস্তবতাকে। কেউ ভয়ে মোবাইল ফোনটাই অন করবেন না। কারণ সেখানে অপেক্ষা করছে হাজারো বার্তার পাহাড়—কিছু সান্ত্বনা, কিছু তীব্র সমালোচনা, আর পরিবারের ব্যাকুল ফোন।

একটি মুহূর্তের কাছে বন্দি জীবন

নিজের ভেতরের অন্তহীন এক প্রশ্ন বারবার তাড়া করে ফিরবে—‘আরেকটু যদি পারতাম!’

বিশ্বকাপ থেকে বাড়ি ফেরার ফ্লাইটের দূরত্ব মানচিত্রে নিখুঁতভাবে মাপা যায়, তার দৈর্ঘ্য কিলোমিটারে হিসেব করা যায়। কিন্তু সেই মনস্তাত্ত্বিক যাত্রার দৈর্ঘ্য কোনো স্কেলে মাপা যায় না। সেই যাত্রা দীর্ঘ হয় কেবল স্মৃতিতে।

  • একটি ভুল পাস,

  • একটি মিস করা সুবর্ণ সুযোগ,

  • পোস্ট ঘেঁষে চলে যাওয়া একটি শট,

  • গোলরক্ষকের দুর্দান্ত একটি সেভ,

  • কিংবা স্রেফ একটি সেকেন্ডের ভুল সিদ্ধান্ত।

এই অনুশোচনাগুলো বারবার মনের পর্দায় ফিরে ফিরে আসে। বিমান তীব্র গতিতে সামনে এগিয়ে যায়, অথচ মন পড়ে থাকে পেছনের সেই এক চিলতে ফুটবল মাঠে। একসময় বিমান নামবে প্যারিস কিংবা মাদ্রিদের মাটিতে। বাইরে প্রথা অনুযায়ী অপেক্ষা করবেন সমর্থকেরা। কেউ পতাকা ওড়াবেন, কেউ করতালি দেবেন, কেউ শুধু একবার চোখের দেখা দেখতে চাইবেন তাদের নায়কদের।

তারা বাড়ি ফিরবেন ঠিকই, কিন্তু সত্যিই কি মন থেকে ফিরতে পারবেন? বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া একজন ফুটবলারের কিছুটা অংশ হয়ত সারাজীবন সেই মাঠেই ফেলে আসতে হয়—শেষ বাঁশির শব্দের কাছে, স্কোরবোর্ডের নিচে, সেই একটি নির্মম মুহূর্তের কাছে।

ফ্রান্স কিংবা স্পেন—একটি দল আজ সামনে এগিয়ে যাবে ট্রফির দিকে, অন্য দলটি উঠবে বাড়ি ফেরার বিমানে। বিমানটি হয়ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে দেবে তাদের শরীরকে, কিন্তু কিছু পরাজয় থেকে মনের বাড়ি ফিরতে কখনো কখনো আস্ত একটি জীবনও কম পড়ে যায়। সেটিই বিশ্বকাপের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে ভারী এবং সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা। বাড়ি ফেরার সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency