অর্থনীতি ও জ্বালানি ডেস্ক | যুগান্তর
সর্বশেষ আপডেট: ১৩ জুলাই, ২০২৬
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের এই অচলাবস্থা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যদিও সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৪ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির (LNG) দাম আকস্মিক বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ সামলানো কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু জ্বালানি তেল এবং এলএনজি বেশি দামে আমদানি করে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করার কারণে সরকারের প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত শুধু তেল আমদানিতেই তাদের লোকসান বা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা লোকসান হয়েছে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানিতে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত চার মাসে তেলের ভর্তুকি বাবদ সরকারের অর্থ বিভাগ থেকে বিপিসিকে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। সংস্থাটি তাদের ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ (ERL-2) প্রকল্প এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা তহবিল থেকে এই ঘাটতি মেটাতে বাধ্য হয়েছে। এখন ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ আবারও বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘সরকার টু সরকার’ (G2G) প্রক্রিয়ায় ১৬ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল এবং জেট ফুয়েল) কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে সরকার। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এ সংক্রান্ত সমঝোতা সফলভাবে শেষ হয়েছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ জুন সিঙ্গাপুরে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের উপস্থিতিতে ১০টি বৈশ্বিক সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া বা প্রিমিয়াম যেখানে ১৪ ডলারের বেশি দাবি করা হচ্ছিল, সেখানে ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আইওসিএল (IOCL) সর্বপ্রথম ৯.৫ ডলার প্রিমিয়ামে তেল দিতে রাজি হয়। পরবর্তীতে ইউনিপেক ও পেট্রো চায়নাসহ ৪-৫টি কোম্পানি একই দরে তেল সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়। এর ফলে উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় বাংলাদেশের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিবহন খরচ সাশ্রয় হয়েছে। রোববার (১২ জুলাই) বিপিসি এই ১৬ লাখ টন তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যা এখন ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে। এই তেল কিনতে সরকারের প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গত মার্চ মাস থেকে কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি বাংলাদেশকে এলএনজি সরবরাহ করছে না। ফলে পেট্রোবাংলাকে সম্পূর্ণভাবে স্পট মার্কেটের (উন্মুক্ত বাজার) ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান রোববার এ বিষয়ে বলেন:
"হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেল এবং এলএনজির দাম নিশ্চিতভাবে বাড়বে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। গত মাসে সাময়িক যুদ্ধবিরতির কারণে এলএনজির দাম অনেক কমে এসেছিল। এখন আন্তর্জাতিক বাজার কোন দিকে যায়, সেটাই দেখার বিষয়।"
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চে স্পট মার্কেটে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট এলএনজি ২৮ ডলারের রেকর্ড মূল্যে কিনতে হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতির প্রভাবে গত সপ্তাহে তা কমে ১৬ থেকে ১৭ ডলারে নেমে এসেছিল। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ড ক্রুড তেল গত শুক্রবার প্রতি ব্যারেল ৭৬.১০ ডলারে বিক্রি হলেও মার্চ-এপ্রিলে যুদ্ধ চলাকালীন তা ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) বাজার খোলার পর তেলের নতুন দর নির্ধারিত হবে।
ডিজেলের মজুত: বিপিসির ট্যাংকিতে বর্তমানে ৪ লাখ ১৪ হাজার টন ডিজেল রয়েছে, যা দিয়ে ৩৪ দিন চলবে।
অকটেনের মজুত: দেশের ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত অকটেন রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ৪০ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব।
আমদানি সূচি: জুলাই মাসের চলতি সপ্তাহে আরও ৮ থেকে ১০টি ডিজেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে।
আমদানি বিলের তারতম্য: যুদ্ধের পিকে ৩০ হাজার টনের একটি ডিজেল জাহাজের বিল ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে উঠলেও বর্তমানে তা ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
জ্বালানি বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত মার্চের তীব্র জ্বালানি সংকটের তিক্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার আগেভাগেই দেশের সব অঞ্চলের ডিপোগুলোকে সতর্ক ও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি সাময়িক বন্ধ থাকলেও দেশে তাৎক্ষণিকভাবে তেল বা গ্যাসের তীব্র সংকট হবে না বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |