ক্রীড়া প্রতিবেদক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ৯ জুলাই, ২০২৬
ফুটবল বিশ্বে লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো মেগা তারকাদের নিয়ে একটি চিরন্তন ও প্রচলিত ধারণা হলো— মাঠের রেফারিরা সব সময়ই তাদের প্রতি তুলনামূলক বেশি নরম বা সহনশীল থাকেন। বাস্তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ধারণার কিছুটা সত্যতা থাকলেও, এর ভেতরের সমীকরণটি মোটেও এতটা সরল নয়। সাবেক ফিফা রেফারিদের মতে, সুপারস্টাররা কখনও কখনও ‘মার্জিনাল’ বা সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তে কিছুটা সুবিধা পেয়ে থাকেন, তবে তা এক শ্রেণির অন্ধ সমর্থকের ধারণার মতো এত বড় পরিসরে কিংবা ইচ্ছেকৃতভাবে নয়।
একই সঙ্গে আরেকটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাও রয়েছে। মাঠে বা মাঠের বাইরে এসব গ্লোবাল আইকনরা যা-ই করেন না কেন, তা অন্য যেকোনো সাধারণ ফুটবলারের তুলনায় বহুগুণ বেশি আলোচিত ও ব্যবচ্ছেদ হয়। ফলে তাদের প্রতিটি ছোটখাটো সিদ্ধান্ত বা ঘটনাকে ঘিরে নেটদুনিয়ায় বিতর্কও তৈরি হয় অনেক বেশি।
চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির একটি ফাউল বা ট্যাকল সেই পুরোনো বিতর্ককেই নতুন করে ফুটবল পাড়ায় সামনে এনেছে। ম্যাচের একপর্যায়ে আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার আইসা মান্দির ওপর করা মেসির ওই চ্যালেঞ্জকে কেউ বলছেন ‘অসাবধানী’, কেউ বলছেন ‘বেপরোয়া’, আবার কট্টর সমালোচকরা একে দেখছেন ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এটিকে এমন আরেকটি বৈষম্যমূলক ঘটনা বলে উল্লেখ করছেন, যেখানে মেসি এমন একটি মারাত্মক অপরাধের জন্য বড় শাস্তি (যেমন লাল কার্ড) এড়িয়ে গেছেন, যেটির জন্য অন্য কোনো সাধারণ খেলোয়াড় হলে নির্ঘাত মাঠ ছাড়তে হতো।
তবে সাবেক রেফারিদের নিখুঁত টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ বলছে, মাঠে থাকা অধিকাংশ রেফারিই এ ঘটনার জন্য সরাসরি ‘লাল কার্ড’ দেখাতেন না। কারণ, ট্যাকলটিতে ইচ্ছাকৃত আঘাত বা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের (Excessive Force) কোনো স্পষ্ট বা অকাট্য প্রমাণ ছিল না। ম্যাচটির মূল দায়িত্বে ছিলেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল পরিচালনা করা পোল্যান্ডের অভিজ্ঞ রেফারি শিমন মারচিনিয়াক। তিনি ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তব গতিতে দেখে সেটিকে গুরুতর ফাউল বা লাল কার্ডের যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেননি।
এ ক্ষেত্রে আলজেরিয়ার খেলোয়াড়দের মাঠের প্রতিক্রিয়াও বড় একটি ভূমিকা পালন করেছে। সাধারণত ইচ্ছাকৃত বা জঘন্য আঘাতের ঘটনায় সতীর্থরা ক্ষোভে রেফারিকে ঘিরে ধরে প্রতিবাদ করেন এবং ভিএআর-এর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালান। কিন্তু এই সুনির্দিষ্ট ঘটনায় আলজেরিয়ার ফুটবলারদের মধ্যে তেমন কোনো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এটিও একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। কারণ, মাঠের খেলোয়াড়রা যখন কোনো সিদ্ধান্ত বদলের দাবি জোরালোভাবে তোলেন না, তখন অপ্রয়োজনীয়ভাবে খেলা থামিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও পর্যালোচনা করায় ভিএআর কর্মকর্তারা প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়েন।
অবশ্য টিভির স্লো-মোশন বা ধীরগতির রিপ্লেতে ঘটনাটি কিছুটা জটিল ও ভয়ংকর মনে হয়েছে। স্লো-মোশনে দেখা যায়, মেসির বুটের নিচের স্টাড আইসা মান্দির পায়ের কাফে লেগেছে। এতে মান্দি কিছুটা ব্যথাও পেয়েছেন। এই কারণে কিছু ভিএআর কর্মকর্তা চাইলে রেফারিকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখার (On-field Review) অনুরোধ করতে পারতেন। সেক্ষেত্রে মারচিনিয়াক ধীরগতির রিপ্লে দেখে হয়তো সিদ্ধান্ত বদলে লাল কার্ডও দেখাতে পারতেন।
তবে ফিফার অফিশিয়াল আইন অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে হলে প্রমাণ থাকতে হবে যে খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের নিরাপত্তাকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলেছেন। বাস্তব গতিতে ঘটনাটি দেখলে সেটি মোটেও ইচ্ছাকৃত বা অতিমাত্রায় শক্তিশালী ট্যাকল মনে হয়নি এবং মান্দি কোনো চিকিৎসাও নেননি, যা লাল কার্ডের পক্ষে যুক্তিকে দুর্বল করে দেয়। সাবেক এক রেফারির মতে, মারচিনিয়াকের শুধু ফ্রি-কিক দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক থাকলেও, মেসির অন্তত একটি ‘হলুদ কার্ড’ পাওয়া উচিত ছিল।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, একই ঘটনা যদি উল্টো হতো— অর্থাৎ মেসিই যদি এমন ট্যাকলের শিকার হতেন— তাহলেও কি একই সিদ্ধান্ত আসত? এর নিশ্চিত উত্তর দেওয়া কঠিন। রেফারিদের নিরপেক্ষ থাকার নিয়মের মধ্যেও খেলোয়াড়ের পরিচিতি, ব্যক্তিত্ব কিংবা অতীতের ভালো ভাবমূর্তি অনেক সময় অবচেতন মনেই সিদ্ধান্তে সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তি ফুটবলারদের ক্ষেত্রে ভুলবশত কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে যে তীব্র বিশ্বব্যাপী সমালোচনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়তে হয়, সেটিও রেফারিদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করে। এর বড় উদাহরণ সাবেক ইংলিশ রেফারি মাইকেল অলিভারের ঘটনা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনকে লাল কার্ড দেখানোর পর অলিভারের স্ত্রী পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ঘৃণামূলক বার্তার শিকার হয়েছিলেন। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েও রেফারিরা এই মানসিক ট্রমা বা চাপ এড়াতে পারেন না।
সবশেষে সাবেক রেফারিদের বক্তব্য, মাঠের রেফারিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় চোখের পলকে, বাস্তব গতিতে; অথচ দর্শকরা সেটি বিশ্লেষণ করেন চার-পাঁচটি কোণ থেকে ধীরগতির রিপ্লে দেখে। ফলে মূল্যায়নের মধ্যে এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক।
বিতর্কিত ট্যাকল: বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার আইসা মান্দির ওপর মেসির একটি ট্যাকল নিয়ে ফুটবল বিশ্বে রেফারিং পক্ষপাতিত্বের নতুন বিতর্ক।
মারচিনিয়াকের সিদ্ধান্ত: কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল রেফারি শিমন মারচিনিয়াক বাস্তব গতিতে দেখে এটিকে লাল কার্ডের যোগ্য মনে করেননি।
ভিএআর সমীকরণ: স্লো-মোশনে বুটের স্টাড মান্দির পায়ে লাগলেও আলজেরিয়ার খেলোয়াড়রা তীব্র প্রতিবাদ না করায় ভিএআর রেফারিকে ডাকেনি।
ব্যক্তিপূজার প্রভাব: মেসি বা রোনালদোর মতো তারকাদের ভুল কার্ড দেখালে রেফারিদের যে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়, তা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে।
ধূসর অঞ্চলের সুবিধা: বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো পক্ষপাতিত্ব নয়, বরং সিদ্ধান্ত যেখানে ৫০-৫০ বা ধূসর অঞ্চলে থাকে, সেখানে তারকারা সামান্য সুবিধা পান।
স্পোর্টস ডেস্ক | ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬, লিওনেল মেসির ফাউল, শিমন মারচিনিয়াকের রেফারিং ও ফিফা লাল কার্ড নিয়ম সেল
আলজেরিয়া ম্যাচের এই বিতর্কিত ফাউল নিয়ে ফিফার টেকনিক্যাল কমিটি রেফারি মারচিনিয়াককে কোনো বিশেষ রিপোর্ট দিল কিনা, কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার ম্যাচের রেফারি কে হচ্ছেন এবং বিশ্বকাপের রেফারিং বিতর্কের প্রতি মুহূর্তের লাইভ আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |