| বঙ্গাব্দ

লেবাননের খ্রিষ্টানরা ইসরাইলে যোগ দিতে চায়! নেতানিয়াহুর আজব দাবি

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 06-07-2026 ইং
  • 12516 বার পঠিত
লেবাননের খ্রিষ্টানরা ইসরাইলে যোগ দিতে চায়! নেতানিয়াহুর আজব দাবি
ছবির ক্যাপশন: নেতানিয়াহুর আজব দাবি

লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত’ মন্তব্যের পর এবার খ্রিষ্টান দরদ দেখাচ্ছেন নেতানিয়াহু; ফক্স নিউজে কোনো প্রমাণ ছাড়াই বিস্ফোরক দাবি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ৬ জুলাই, ২০২৬

লেবাননে ইসরাইলি বিমান ও স্থল বাহিনীর বর্বর হামলায় একের পর এক ঐতিহাসিক গির্জা ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় স্থান মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে এবার এক অদ্ভুত ও বিতর্কিত দাবি করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার দাবি—লেবাননের খ্রিষ্টানরাই নাকি তাদের নিজেদের গ্রামগুলোকে ইসরাইল রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘যুক্ত’ (Annex) করার জন্য তেল আবিবের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছেন।

গত রোববার (৫ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কট্টর ইসরাইলপন্থি সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের (Fox News) জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’-এ সঞ্চালক জ্যাকি হেনরিখকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু দম্ভোক্তি করে বলেন, “আমরা সবসময় আমাদের বন্ধুদের যত্ন নিই, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানদের।”

সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন:

“লেবাননের কয়েকটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত গ্রাম আসলে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কারণ, আমরা তাদের হিজবুল্লাহর চরমপন্থিদের হাত থেকে রক্ষা করি, যারা তাদের হত্যা করতে চায়। আর শুধু লেবানন নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সব জায়গাতেই খ্রিষ্টানদের সুরক্ষায় আমরা একই কাজ করে থাকি।”

তবে খোদ লেবাননের মাটিতে ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) নিজেদের নৃশংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এই অদ্ভুত দাবির বিন্দুমাত্র মিল নেই। সেখানে ইসরাইলি বাহিনী একের পর এক পবিত্র গির্জা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, খ্রিষ্টানদের প্রাচীন উপাসনালয়গুলোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে এবং খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রতীকের অবমাননা করার একাধিক চাক্ষুষ ভিডিও খোদ ইসরাইলি সেনাদের মাধ্যমেই সামাজিক মাধ্যমে সামনে এসেছে।

নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে খ্রিষ্টানদের প্রতি এই দরদ দেখালেন, যার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সরাসরি বলেছিলেন, “পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত।” অধিকৃত দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরাইলি সেনার মৃত্যুর পর তিনি ওই চরম উগ্র মন্তব্য করেছিলেন।

দাবির সপক্ষে নেই কোনো প্রমাণ; হিজবুল্লাহর মিত্র খ্রিষ্টানরাই

গাজায় ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘোরা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফক্স নিউজের লাইভ অনুষ্ঠানে তার এই আজব দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ বা নথিপত্র পেশ করতে পারেননি। লেবাননের কোনো খ্রিষ্টান গ্রাম বা তাদের জনপ্রতিনিধিরা ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছে বা আইডিএফ-এর কাছে সামরিক সুরক্ষা চেয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি। এমনকি হিজবুল্লাহ কোনো খ্রিষ্টান গ্রামে সুনির্দিষ্টভাবে হামলা চালিয়েছে, এমন প্রমাণও নেই। উলটো লেবাননের মূলধারার রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর প্রধান ও দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য খ্রিষ্টান মিত্র হলো দেশটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ‘ফ্রি প্যাট্রিয়টিক মুভমেন্ট’ (FPM)।

ইসরাইলের ‘খ্রিষ্টান সমস্যা’ ও যিশুর মূর্তি ভাঙার ভাইরাল ভিডিও

লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সহ দেশটির ওপর নির্বিচার হামলার কারণে ইসরাইল যখন বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়েছে, ঠিক তখনই পশ্চিমা বিশ্বের সহানুভূতি পেতে খ্রিষ্টানদের সুরক্ষা দেওয়ার এই সাজানো গল্প ফাঁদলেন নেতানিয়াহু।

বাস্তব চিত্র হলো, গত মে মাসে ফরাসি মানবাধিকার সংগঠন ‘ল্যুবর দোরিঅঁ’ (L’Œuvre d’Orient) তাদের এক তদন্ত প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছিল যে, লেবাননের ইয়ারুন গ্রামে গ্রিক ক্যাথলিক ধর্মীয় সম্প্রদায় ‘সালভাটোরিয়ান সিস্টারস’-এর একটি ঐতিহ্যবাহী মঠ সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী।

এর আগে গত এপ্রিলে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায়—দক্ষিণ লেবাননে প্রবেশ করা এক ইসরাইলি সেনা ড্রিল মেশিন (জ্যাকহ্যামার) দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশু খ্রিষ্টের একটি পবিত্র মূর্তি অত্যন্ত বর্বরভাবে ভাঙছেন। পরবর্তীতে খ্রিষ্টান বিশ্ব তীব্র প্রতিবাদ জানালেও ইসরাইলের প্রধান রাব্বিনেট (সর্বোচ্চ ইহুদি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ) ওই সেনার মূর্তি ভাঙার ঘটনার নিন্দা জানাতে সাফ অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ভাইরাল হওয়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণ লেবাননে আইডিএফ-এর এক সেনা ভার্জিন মেরির (কুমারী মেরি) মূর্তিকে লাঞ্ছিত ও অবমাননা করছেন। গত বছরও দক্ষিণ লেবাননের দেরদঘায়া গ্রামে মেলকাইট গ্রিক ক্যাথলিক সেন্ট জর্জ চার্চকে বিমান থেকে ভারী বোমা মেরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় ইসরাইলি বিমান বাহিনী।

ইসরাইলের এই ধর্মীয় বিদ্বেষী হামলা কেবল লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপরই সীমাবদ্ধ নেই। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেও (ওয়েস্ট ব্যাংক) উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানদের শত বছরের পুরনো গ্রাম ও জলপাই বাগান পুড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের ওপর থুতু ফেলা ও গির্জায় অগ্নিসংযোগের সহিংসতাও জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থক গোষ্ঠী ‘ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের’ (Evangelical Christians) কাছে তেল আবিবের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর এই কারণেই নেতানিয়াহু ফক্স নিউজে এসে এই সাফাই গাইলেন।

৪ হাজার ৩০০ ছাড়াল লেবাননে নিহতের সংখ্যা

সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে অবান্তর দাবির পরিধি আরও বাড়িয়ে নেতানিয়াহু বলেন, “শুধু লেবাননের খ্রিষ্টানরাই আমাদের কাছে সুরক্ষা চায় না। দেশটির দ্রুজ সম্প্রদায়, সুন্নি মুসলিম এবং বেশ কিছু শিয়া মুসলিমও আমাদের কাছে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সুরক্ষা চাইছে।” তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননের এই গোষ্ঠীগুলোর কেউ ইসরাইলের কাছে আদৌ কোনোদিন সুরক্ষা চেয়েছে কিনা, তার কোনো ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননের ভেতরে ইসরাইলের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ও স্থল আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ৪ হাজার ৩০৪ জন নিরীহ লেবানিজ নাগরিক নিহত এবং ১২ হাজার ২০৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নাগরিক।

এক নজরে ফক্স নিউজে নেতানিয়াহুর ইন্টারভিউ বিতর্ক (৬ জুলাই, ২০২৬)

  • নেতানিয়াহুর দাবি: লেবাননের খ্রিষ্টান গ্রামগুলো হিজবুল্লাহর হাত থেকে বাঁচতে ইসরাইলের সাথে যুক্ত হতে চায়

  • বাস্তবতা: লেবাননের মূল রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর প্রধানতম মিত্র খ্রিষ্টানদের দল ‘ফ্রি প্যাট্রিয়টিক মুভমেন্ট’

  • গির্জা ধ্বংস: আইডিএফ-এর বোমায় মাটির সাথে মিশে গেছে সালভাটোরিয়ান সিস্টারস মঠ ও সেন্ট জর্জ চার্চ

  • ধর্মীয় অবমাননা: দক্ষিণ লেবাননে যিশু খ্রিষ্ট ও কুমারী মেরির মূর্তি ভাঙচুর-অবমাননা করেছে ইসরাইলি সেনারা

  • উগ্রপন্থী হুঁশিয়ারি: ক’দিন আগেই ইসরাইলের মন্ত্রী বেন-গ্যভির বলেছিলেন—‘পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত’

  • ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা: গত ২ মার্চ থেকে ইসরাইলি আগ্রাসনে লেবাননে ৪,৩০৪ জন নিহত ও ১২,২০৩ জন আহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | মধ্যপ্রাচ্য, লেবানন সংকট ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি সেল

ফক্স নিউজে নেতানিয়াহুর এই ইন্টারভিউয়ের পর লেবানন সরকারের আনুষ্ঠানিক তীব্র প্রতিক্রিয়া, দক্ষিণ লেবাননের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত মার্জায়ুন ও ইয়ারুন অঞ্চলের বর্তমান মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি, আইসিসি’র গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency