| বঙ্গাব্দ

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু চরম বিরোধ; ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কি শেষের পথে?

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 06-07-2026 ইং
  • 12668 বার পঠিত
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু চরম বিরোধ; ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কি শেষের পথে?
ছবির ক্যাপশন: ট্রাম্প-নেতানিয়াহু চরম বিরোধ

‘সবাই তোমাকে ও ইসরাইলকে ঘৃণা করে’; ফাঁস হওয়া অডিও এবং ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর চার দশকের সবচেয়ে ভঙ্গুর সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ৬ জুলাই, ২০২৬

ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও মারাত্মক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে এখন একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—দুই দেশের মধ্যকার কয়েক দশকের এই বিশেষ ‘অটুট সম্পর্ক’ কি তবে চিরতরে শেষ হতে চলেছে?

ইসরাইলের শীর্ষ রাজনৈতিক মহলের অনেকের কাছেই এখন এটি প্রায় অবধারিত মনে হচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করতে যাচ্ছেন। ১৯৪৮ সালে অসংখ্য ইহুদিবাদী মিলিশিয়াকে একত্রিত করে ইসরাইলি সেনাবাহিনী (IDF) গঠিত হওয়ার পর থেকে মূলত মার্কিন এই শক্তিশালী জোটই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের টিকিয়ে রাখতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই সম্পর্কের দেয়ালে বড় ফাটল ধরেছে।

নেতানিয়াহুর বিপজ্জনক রাজনৈতিক পথ ও ট্রাম্পের ‘পাগল’ আখ্যা

বর্তমানে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এক চরম বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে হাঁটছেন। দেশের ভেতরে তার বিরুদ্ধে চলা একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে সরাসরি কারাবাসের তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। এর পাশাপাশি, চলতি বছরের শেষ দিকে ইসরাইলে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর চরম শঙ্কায় ভুগছেন তিনি। একদিকে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করে ইরানের সঙ্গে একটি টেকসই বৈশ্বিক চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের তীব্র চাপ, অন্যদিকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে উগ্র ইসরাইলি জনগণের আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে নেতানিয়াহু তার দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে কঠিন ও অন্ধকার সময় পার করছেন।

২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে পূর্ববর্তী যুদ্ধের সময় থেকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে প্রথম প্রকাশ্য মতবিরোধের খবর পাওয়া গিয়েছিল। তেহরানকে কীভাবে ও কোন কৌশলে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে তৈরি হওয়া সেই দ্বিমত এক বছর পর বর্তমানে আরও চরম অবনতির দিকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির আলোচনায় ইরান অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে যে—দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে হবে। আর এই শর্তের ফলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

গত মাসে ফাঁস হওয়া একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ফোন কলের অডিওতে (যা হোয়াইট হাউস আজ পর্যন্ত অস্বীকার করেনি) শোনা যায়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধে অস্বীকৃতি জানানোয় নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত কড়া ও নোংরা ভাষায় ভর্ৎসনা করছেন। খবরে প্রকাশ, ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং মার্কিন সহায়তার বিপরীতে চরম অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ তুলে বলেছেন, তার (ট্রাম্পের) সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলে নেতানিয়াহুকে এত দিনে দুর্নীতির দায়ে জেলেই কাটাতে হতো। ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে নেতানিয়াহুকে আরও বলেন:

“বিশ্বের সবাই এখন তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণা করে। আর তোমার এই জেদের কারণে সবাই এখন ইসরাইল রাষ্ট্রটাকেও ঘৃণা করতে শুরু করেছে।”

এমনকি গত সপ্তাহে প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প দম্ভোক্তি করে বলেন, নেতানিয়াহু খুব ভালো করেই “জানেন যে বস কে (Who the boss is)”। এটি মূলত দুই বিশ্বনেতার মধ্যে চলমান উত্তেজনাকর ও তিক্ত সম্পর্কেরই এক প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি।

ম্যাগা (MAGA) শিবিরের অস্বস্তি ও অস্ত্র সরবরাহের হুঁশিয়ারি

গত জুনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ট্রাম্পই বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি ইসরাইলের প্রতি কিছুটা হলেও সহানুভূতিশীল। তবে ওয়াশিংটন-তেহরানের সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির সমালোচনাকারী কট্টরপন্থি ইসরাইলি মন্ত্রীদের স্পষ্টভাবে সতর্ক করে তিনি বলেন, “আজ যেসব প্রতিরক্ষামূলক আকাশ অস্ত্র আপনাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করছে, তার দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকানদের কারখানায় তৈরি এবং সাধারণ আমেরিকান করদাতাদের অর্থে কেনা।”

সাম্প্রতিক একাধিক আন্তর্জাতিক জরিপ বলছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণই ইসরাইলের বিপক্ষে যাচ্ছে না, বরং ট্রাম্পের ডানপন্থি জনতাবাদী ‘মেক আমেরিকা` গ্রেট এগেইন’ (MÁGA) আন্দোলনের ভেতরের একাংশের মধ্যেও ইসরাইল নিয়ে প্রবল সংশয় ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। মার্জোরি টেইলর গ্রিনের মতো কট্টর ম্যাগা-সমর্থকেরা ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তার কঠোর সমালোচনা করেছেন। মার্কিন ডানপন্থি রাজনীতির অন্যতম সরব সমালোচক ও সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক টাকার কার্লসন গত জুনের শেষ দিকে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত অনুধাবন করতে পেরেছেন যে ইসরাইলই আসলে মার্কিন প্রশাসনের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় হুমকি। কার্লসন অভিযোগ করেন, ইসরাইল প্রতিবেশী লেবাননে আরেকটি যুদ্ধ শুরুর অজুহাত হিসেবে ইরানে বড় ধরনের হামলা চালাতে ট্রাম্পকে এতদিন ‘তোষামোদ, প্ররোচিত ও ব্ল্যাকমেইল’ করে আসছিল।

৭২ হাজার প্রাণহানি ও ইসরাইলের আন্তর্জাতিক একঘরে দশা

ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং সিএসআইএস (CSIS) বিশ্লেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান আল জাজিরাকে বলেন, “রিপাবলিকান দল ঐতিহ্যগতভাবে ইসরাইলপন্থি হলেও ট্রাম্পের নিজস্ব একটি অনুগত সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে এবং তিনি প্রমাণ করেছেন যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে তিনি নিজের পথে টানতে পারেন। এক্ষেত্রে অনেক ডেমোক্র্যাটও ট্রাম্পের সাথে যোগ দেবেন, কারণ ডেমোক্র্যাটিক পার্টিও এখন ইসরাইলের কঠোর সমালোচক।”

ইসরাইলের ইতিহাসে মার্কিন সামরিক সহায়তার গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১৬ সালের এক ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকের (MoU) আওতায় ইসরাইল ১০ বছরে ৩ হাজার ৮০০ কোটি (৩৮ বিলিয়ন) ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা পাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্য কোনো দেশের সাথে সর্ববৃহৎ সামরিক চুক্তি। গাজায় ইসরাইলের বিশ্বব্যাপী নিন্দিত ‘গণহত্যামূলক’ (Genocidal War) যুদ্ধের সময়ও মার্কিন ভেটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় অন্তত ৭২ হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং এই ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্কে ইসরাইলকে বাঁচাতে ওয়াশিংটন অন্তত ছয়বার তাদের বিশেষ ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের দামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গে নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তৈরি হওয়া এই ঐতিহাসিক দূরত্ব এবং বিশ্বমঞ্চে ইসরাইলের একঘরে দশাকে প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার করছেন। ইয়ার লাপিদ এক্সে (টুইটার) লিখেছেন, “আমরা যদি দ্রুত এই ব্যর্থ সরকার পরিবর্তন করতে না পারি, তবে বিশ্বের বুকে ইসরাইলের বৈদেশিক সম্পর্ক পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”

অন্যদিকে, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকোট, যিনি চলতি বছরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী দাবিদার, তিনিও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন—নেতানিয়াহুর ভুল নীতির কারণেই ট্রাম্প আজ একা চলতে এবং ইরানের সঙ্গে চুক্তির পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ইসরাইলকে তার এক নম্বর মিত্রের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

এক নজরে মার্কিন-ইসরাইল কূটনৈতিক সংকটের মূলবিন্দু (৬ জুলাই, ২০২৬)

  • ফাঁস হওয়া অডিও: লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ না করায় নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ ও ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে ভর্ৎসনা ট্রাম্পের

  • ভ্যান্সের হুঁশিয়ারি: ইসরাইলের দুই-তৃতীয়াংশ অস্ত্রই মার্কিন করদাতাদের টাকায় কেনা, মনে করিয়ে দিলেন জেডি ভ্যান্স।

  • ম্যাগা শিবিরের ক্ষোভ: টাকার কার্লসনের দাবি—মার্কিন প্রশাসনের জন্য ইসরাইলই এখন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি

  • গাজার ট্র্যাজেডি: ২০২৩ থেকে গাজায় ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, জাতিসংঘে ৬ বার ভেটো দিয়ে ইসরাইলকে বাঁচিয়েছে ইউএস।

  • ইসরাইলি রাজনীতি: ট্রাম্পের সাথে দূরত্বকে পুঁজি করে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মাঠে নেমেছেন ইয়ার লাপিদ ও গাদি আইজেনকোট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | মধ্যপ্রাচ্য, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি সেল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির খসড়া শর্তাবলী, দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতে ইসরাইলি বিমান হামলার সর্বশেষ গ্রাউন্ড আপডেট, তেল আবিবের মার্কিন দূতাবাসে ওয়াশিংটনের নতুন কূটনৈতিক নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency