| বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যে এক দশকে ৬ প্রধানমন্ত্রীর পতন: ব্রিটিশ রাজনীতির অস্থিরতার নেপথ্যে

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 23-06-2026 ইং
  • 16489 বার পঠিত
যুক্তরাজ্যে এক দশকে ৬ প্রধানমন্ত্রীর পতন: ব্রিটিশ রাজনীতির অস্থিরতার নেপথ্যে
ছবির ক্যাপশন: যুক্তরাজ্যে এক দশকে ৬ প্রধানমন্ত্রীর পতন: ব্রিটিশ রাজনীতির অস্থিরতার নেপথ্যে

১০ বছরে ৬ জন! ক্যামেরন থেকে কিয়ার স্টারমার—ব্রিটেনের টালমাটাল রাজনীতির এক দশকের চালচিত্র

আন্তর্জাতিক ও ইউরোপ ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬

যুক্তরাজ্যের রাজনীতি গত এক দশকে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় নেতৃত্বের জন্য বিশ্বজুড়ে যে ব্রিটিশ রাজনীতির এক বিশেষ খ্যাতি ছিল, সেখানে এত ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০১৬ সালে ঐতিহাসিক ব্রেক্সিট (Brexit) গণভোটের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটি একে একে ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর উত্থান ও পতন দেখেছে। ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে যে ধারাবাহিকতার শুরু হয়েছিল, তার সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে গতকাল সোমবার (২২ জুন) বিদায় নিয়েছেন কিয়ার স্টারমার। মাঝের এই এক দশকে একে একে ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি হাতে নিয়েছেন থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাক। বিশ্ববিখ্যাত সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির এক যৌথ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন থেকে এই অস্থিরতার আদ্যোপান্ত জানা গেছে।

১. ডেভিড ক্যামেরন (পদত্যাগ: ২০১৬)

২০১০ সাল থেকে সফলভাবে ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) থাকার পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু গণভোটে ব্রিটিশ জনগণ নাটকীয়ভাবে ইইউ ত্যাগের পক্ষে রায় দিলে রাজনৈতিক নৈতিকতা ও দায় স্বীকার করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ক্যামেরনের মতে, ব্রেক্সিট সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য দেশে সম্পূর্ণ নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল।

২. থেরেসা মে (পদত্যাগ: ২০১৯)

ক্যামেরনের আকস্মিক উত্তরসূরি হিসেবে ব্রিটেনের হাল ধরেন থেরেসা মে। তিনি ব্রেক্সিট কার্যকর করার গুরুদায়িত্ব নিলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর করা দীর্ঘ আলোচনার চুক্তিগুলো বারবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত ও ব্যর্থ হয়। এর ফলে সৃষ্ট দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নিজ দলের ভেতর থেকে ক্রমবর্ধমান অনাস্থা ও চাপের মুখে ২০১৯ সালে চোখের জলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন মে।

৩. বরিস জনসন (পদত্যাগ: ২০২২)

থেরেসা মে’র পর ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতায় আসেন উগ্র ব্রেক্সিটপন্থী নেতা বরিস জনসন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ (Get Brexit Done) স্লোগানে তিনি বিপুল জনসমর্থন পান এবং শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করে দেখান। তবে কোভিড-১৯ মহামারির বিশ্বব্যাপী লকডাউনের সময়ে সরকারি কার্যালয়ের ভেতরে নিয়ম ভেঙে তাঁর মদ ও পার্টির আয়োজন, যা বিশ্বজুড়ে ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত, তাঁর নৈতিক ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। একের পর এক মন্ত্রী ও সহযোগীদের পদত্যাগের পর শেষ পর্যন্ত নিজ দলের আস্থা হারিয়ে ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন জনসন।

৪. লিজ ট্রাস (পদত্যাগ: ২০২২)

জনসনের বিদায়ের পর কনজারভেটিভ দলের রাশ ধরেন লিজ ট্রাস। তবে তাঁর মেয়াদ ছিল ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রিত্ব। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই তিনি কর কমানো ও ব্যাপক ঋণনির্ভর একটি অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা বৈশ্বিক বন্ড বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ফলে ব্রিটিশ পাউন্ডের দর রেকর্ড পরিমাণে পড়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়। ফলস্বরূপ, নিজ দলের তীব্র বিরোধিতার মুখে মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ট্রাস।

৫. ঋষি সুনাক (পদত্যাগ: ২০২৪)

লিজ ট্রাসের ঐতিহাসিক বিদায়ের পর যুক্তরাজ্যের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ঋষি সুনাক। তিনি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও—জীবনযাত্রার চরম ব্যয় বৃদ্ধি, ইউরোপের অবৈধ অভিবাসন সংকট, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) খাতের বেহাল দশা এবং দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ সরকারের প্রতি পুঞ্জীভূত জনঅসন্তোষ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল লেবার পার্টির কাছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে এবং নির্বাচনে হেরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন।

৬. কিয়ার স্টারমার (পদত্যাগ: ২০২২ জুন, ২০২৬)

২০২৪ সালের সেই সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে ব্রিটেনের মসনদে বসেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। ব্রেক্সিট-পরবর্তী অস্থির রাজনীতিতে স্থায়িত্ব আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাকেও বিদায়ের ঘোষণা দিতে হয়েছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে লেবার পার্টির অত্যন্ত খারাপ ফলাফল, দলের অভ্যন্তরে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে চরম অসন্তোষ, জনগণের মাঝে তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থন হ্রাস, একের পর এক নীতিগত অবস্থান থেকে ‘ইউ-টার্ন’ নেওয়া এবং ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ‘রিফর্ম ইউকে’ (Reform UK) দলের দ্রুত জাতীয় উত্থানের ফলে স্টারমারের অবস্থান ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দলীয় আইনপ্রণেতাদের সমর্থন হারিয়ে গতকাল সোমবার (২২ জুন) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং যুক্তরাজ্যের নতুন নেতৃত্ব পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করেন।

অস্থিরতার মূল কারণ কী?

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী সমাজ ও রাজনীতির গভীর বিভাজন, কনজারভেটিভ ও লেবার—উভয় ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভোটারদের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রত্যাশা ও চাহিদাই মূলত যুক্তরাজ্যে নেতৃত্বের এই ঘন ঘন রদবদলের প্রধান কারণ। ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরনের বিদায়ের পর থেকে ২০২৬ সালে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ পর্যন্ত মাত্র এক দশকে এই ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনা ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে চিরকাল এক চরম অস্থির ও টালমাটাল অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে থাকবে।

এক নজরে এক দশকের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর শাসনকাল ও পতনের কারণ (২০১৬-২০২৬)

প্রধানমন্ত্রীর নাম ও দলদায়িত্বকাল ও স্থিতিপতনের প্রধান রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক কারণ
ডেভিড ক্যামেরন (কনজারভেটিভ)২০১০ — ২০১৬ব্রেক্সিট গণভোটে ‘ইইউ ত্যাগের’ পক্ষে জনগণের রায় ও নৈতিক পরাজয়।
থেরেসা মে (কনজারভেটিভ)২০১৬ — ২০১৯ব্রেক্সিট চুক্তি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বারবার প্রত্যাখ্যান ও দলের অনাস্থা।
বরিস জনসন (কনজারভেটিভ)২০১৯ — ২০২২করোনা লকডাউনে নিয়ম ভেঙে ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি ও মন্ত্রীদের পদত্যাগ।
লিজ ট্রাস (কনজারভেটিভ)২০২২ (মাত্র ৪৫ দিন)ঋণনির্ভর মিনি-বাজেট পেশ, পাউন্ডের দরপতন ও বন্ড মার্কেটে বিপর্যয়।
ঋষি সুনাক (কনজারভেটিভ)২০২২ — ২০২৪জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সংকট ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিশাল পরাজয়।
কিয়ার স্টারমার (লেবার)২০২৪ — ২০২৬স্থানীয় নির্বাচনে বিপর্যয়, নীতিগত ইউ-টার্ন ও রিফর্ম ইউকে-এর উত্থান।

বিশেষ প্রতিনিধি: BDS Bulbul Ahmed

১০ ডাউনিং স্ট্রিটের নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন প্রক্রিয়া, লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ ভোটাভুটি, রিফর্ম ইউকে প্রধান নাইজেল ফারাজের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বিশ্ব রাজনীতির সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency