জাতীয় ও রাজনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জন ও আলোচনা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে প্রথমেই আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, আর আওয়ামী লীগের জন্যও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তাদের অতীত শাসনামল নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। ফলে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ বলেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত নতুন একটি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪ মাস পার হয়েছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে নতুন সরকারের ভুল-ভ্রান্তি যেমন জনমনে ততটা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি, তেমনি হাসিনাবিরোধী তথা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো তার (হাসিনা) প্রশ্নে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ আছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দেশীয় জনমত কিংবা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন—কোনো পরিস্থিতিই এখন পর্যন্ত হাসিনা বা আওয়ামী লীগের অনুকূলে নেই।
এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত তরুণ প্রজন্ম এখনো রাজপথে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ সক্রিয় ও সংগঠিত রয়েছে। পাশাপাশি তীব্র আওয়ামীবিরোধী জনমতও দেশে বিদ্যমান। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যে আলোচনা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাস্তবতা দেখছেন না রাজনীতিবিদরা। বরং এ ধরনের আলোচনা অনেকাংশেই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার অংশ হতে পারে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ একটি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল হওয়ায় দলটিকে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বাইরে রাখা সহজ হবে না। কিন্তু বর্তমানে দেশে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই; ফলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই দেশের রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত।
শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার প্রসঙ্গ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন বলে মনে করেন না সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, দেশে যে অপরাধ, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। শেখ হাসিনা হোক আর যেই হোক, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে, তিনি যত বড় political নেতা বা ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষ্য কখনোই আরেক ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে না। গণতন্ত্রের নামে নতুন কোনো স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি হলে সেটিও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি হবে। ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতাই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া বা আওয়ামী লীগের আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই সীমিত। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলেও সেটি মূলত দেশের বাইরে, বিশেষ করে সীমান্তের ওপারের কিছু মহল, মিডিয়া এবং বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন একটি বড় রাজনৈতিক সংগঠন ছিল এবং তাদের দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী এখনো দেশেই রয়েছেন। কিন্তু এতবড় গণ-অভ্যুত্থানের পরও দলটির মধ্যে কোনো আত্মসমালোচনা, অনুতাপ বা নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তারা অতীতের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থান থেকেও সরে আসেননি, যা তাদের জনগণ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তবে দলটি যদি নিজেদের অতীতের ভুল-ত্রুটি উপলব্ধি করে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারত এবং নতুনভাবে পরিশীলিত রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে আসতে পারত; তাহলে হয়তো মানুষ তাদের নতুন করে বিবেচনা করলেও করতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণ সে ধরনের কোনো পরিবর্তনের আভাস দেখছে না।
রাজনীতি ও security বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকন উদ্দিন বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্ন হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিষয়টি জবাবদিহি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি জানান, সরকারও কূটনৈতিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, কারণ তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগগুলোর আইনি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
রুকন উদ্দিনের মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত নেবে তিনি বা তার দল ভবিষ্যতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তিনি দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন বা ক্ষমতায় আসবেন—এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই যে তা পূরণের জন্য নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা ব্যক্তির আবির্ভাব প্রয়োজন হবে। তবে এটাও সত্য যে আওয়ামী লীগ একটি পুরোনো ও বড় রাজনৈতিক দল। শুধু নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করে রাখলেই দলটি স্থায়ীভাবে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। দলটি অবশ্যই রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করবে। তবে শেখ হাসিনা বা দল হিসাবে ফিরে আসার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামল নিয়ে জবাবদিহি। জনগণের সামনে সেই সময়ের নানা নেতিবাচক ঘটনা, সিদ্ধান্ত ও বিতর্কের ব্যাখ্যা দিতে হবে। আমার মনে হয় না দলটি খুব সহজে সেই পথ বেছে নেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান, বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনা বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের এখনই দেশে সক্রিয় রাজনীতি করার মতো পরিস্থিতি নেই, কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো এ প্রশ্নে এখনো শর্তহীনভাবে একমত। তবে তাই বলে তারা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকবে না। তারা নানাভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে এবং এ লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়ারও চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে দেশে থাকা তাদের সুপ্ত নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই এসব বিষয় সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলা করতে হবে।
| রাজনৈতিক ও আইনি সূচক | বিশ্লেষকদের মতামত ও বর্তমান বাস্তবতা |
| বর্তমান শাসনকাল | প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকারের সফল ৪ মাস অতিক্রান্ত। |
| প্রধান আইনি বাধা | দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে মুখোমুখি হতে হবে সরাসরি বিচারিক প্রক্রিয়ার। |
| রাজনৈতিক বড় সংকট | গত সাড়ে ১৫ বছরের দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও দমনপীড়নের জবাবদিহির অভাব। |
| অভ্যন্তরীণ জনমত | জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ প্রজন্ম ও বিরোধী শক্তিগুলো এখনো পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ। |
| আওয়ামী লীগের অবস্থান | দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে এখনো আত্মসমালোচনা বা অনুতাপের কোনো লক্ষণ নেই। |
রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
তারেক রহমান সরকারের নতুন নীতিমালা, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগের আইনি স্থিতি এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতির সব ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |