আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক অভিযান বন্ধে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে। মূলত লেবাননে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যন্ত ধীরগতিতে হওয়ার কারণে বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজারে এই আকস্মিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ (Brent Crude)-এর মূল্য আজ শুক্রবার (১৯ জুন) শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ আজ দিনের শুরুর দিকে মার্কিন-ইরান চুক্তির প্রভাবে এর দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সমঝোতা স্মারকটি (MOU) বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তেল ব্যবসায়ীদের চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যেই তেলের বাজারে এই চরম ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগামী আগস্ট মাসে সরবরাহের (August Delivery) চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বর্তমানে ৮০ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বুধবারের (১৭ জুন) পর এবারই প্রথম ৮০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক গণ্ডি পার হলো।
জ্বালানি তেলের দামের এই আকস্মিক বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি লেবাননে ইসরাইলের ধারাবাহিক ও ভারী বিমান হামলায় অন্তত ১৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সদ্য হওয়া ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি চুক্তিকে নতুন করে বড় ধরণের হুমকির মুখে ফেলেছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, আজ শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননে অগ্রসরমান ইসরাইলি পদাতিক বাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর অতর্কিত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চার ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। এই প্রাণঘাতী হামলার জেরে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে নির্ধারিত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পূর্বনির্ধারিত শান্তি বৈঠক তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতেও; আজ জাপান (Nikkei) ও দক্ষিণ কোরিয়ার (Kospi) পুঁজিবাজারে তীব্র পতন ও ওঠানামা দেখা গেছে।
এদিকে, বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি দিয়ে অত্যন্ত সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত পরিসরে পুনরায় জ্বালানি পরিবহন শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘কেপলার’ (Kpler) তাদের সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার (১৮ ১৮ জুন) সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি বিশাল সুপারট্যাংকার প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এই জাহাজগুলো গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পারস্য উপসাগরে নিজেদের জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম বা ট্রান্সপন্ডার (Transponder) সম্পূর্ণ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছিল। এছাড়া হংকংয়ের একটি তেল ট্যাংকার এবং ফ্রান্সের একটি এলএনজি (LNG) ট্যাংকারও আজ এই নৌপথ পার হয়েছে।
তবে কয়েকটি জাহাজের এই প্রতীকী যাতায়াত সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালির বর্তমান বাণিজ্যিক পরিস্থিতি যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। স্বাভাবিক সময়ে এই আন্তর্জাতিক চ্যানেল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০টি পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল করত, যার মাধ্যমে বিশ্বের মোট দৈনিক তেলের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, প্রায় ৫০০-এর বেশি দানবীয় জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার জন্য প্রণালিটির মুখে গভীর সমুদ্রে জটলা পাকিয়ে অপেক্ষা করছে।
যদিও ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় চালুর বিষয়ে নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবুও বৈশ্বিক জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো (Shipping Lines) তাদের কোটি কোটি ডলারের নৌযান এবং ক্রুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অন্তত ৪৬টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, যাতে ১৪ জন নিরীহ নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা শক্তিশালী ‘নৌ-মাইনের’ (Naval Mines) উপস্থিতি নিয়ে তীব্র আতঙ্ক রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নৌবাহিনী দিয়ে পরিষ্কার করতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।
ট্যাংক মালিকদের আন্তর্জাতিক সর্ববৃহৎ সংগঠন ‘ইন্টারট্যাঙ্কো’ (INTERTANKO)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিম উইলকিন্স এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছেন:
"জাতিসংঘ বা মার্কিন কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে নিরাপদ যাতায়াতের স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নৌ-রূপরেখা না পাওয়া পর্যন্ত কোনো দায়িত্বশীল জাহাজ মালিকই তাদের ক্রু ও জাহাজ নিয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারে সাহস পাচ্ছেন না। সামগ্রিক পরিস্থিতি কাগুজে কলমে ইতিবাচক মনে হলেও, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে নাবিকদের জীবনের সুরক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় প্রাধান্য।"
| সূচক ও উপাদান | বর্তমান বাজার ও কৌশলগত অবস্থা |
| ব্রেন্ট ক্রুডের দাম | প্রতি ব্যারেল ৮০.৩৭ ডলার (০.৬৫% বৃদ্ধি)। |
| বৈঠক বাতিল | লেবাননে ৪ ইসরাইলি সেনা নিহতের জেরে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন-ইরান আলোচনা স্থগিত। |
| হরমুজ প্রণালির জট | ৫০০-এর বেশি জাহাজ প্রণালির মুখে অবরুদ্ধ; স্বাভাবিকের চেয়ে চলাচল নগণ্য। |
| প্রধান ঝুঁকি | সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা ইরানি নৌ-মাইন এবং ৪৬টি হামলার অতীত আতঙ্ক। |
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রতি মুহূর্তের ব্রেকিং আপডেটের জন্য চোখ রাখুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |