আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৬
ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ায় হঠাৎ করেই মুসলিম আলেম ও ধর্মীয় প্রতিনিধিদের ওপর এক রহস্যময় রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের (Crackdown) খবর সামনে এসেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের মে মাসে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী রাজধানী মস্কোসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অন্তত আটজন শীর্ষস্থানীয় মুসলিম আলেম ও কমিউনিটি প্রতিনিধিকে আটক করেছে। একই সাথে রাশিয়ার আবাসিক ভবন বা ফ্ল্যাটে মুসলমানদের ‘গণউপাসনা’ বা জামাতে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করে একটি চরম বিতর্কিত আইন পাশের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। রাশিয়ার বাইরে থেকে পরিচালিত একাধিক আন্তর্জাতিক স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ঘটনাগুলো বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ায় উগ্র স্লাভিক জাতীয়তাবাদ ও সুপ্ত ‘ইসলামবিদ্বেষ’ (Islamophobia) নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদিও ক্রেমলিনের কড়া সেন্সরশিপের কারণে রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে এই গণগ্রেফতারের খবর অত্যন্ত সীমিত ও কৌশলে প্রচার করা হয়েছে, তবে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানামুখী বিতর্ক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি (FSB) ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম স্কলারদের টার্গেট করা হয়। আটককৃতদের তালিকায় রয়েছেন:
উইসাম বার্দভিল: কারেলিয়া অঞ্চলের সাবেক মুফতি। গত ১৪ মে মস্কোর শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে পুলিশের সঙ্গে ‘অবাধ্যতার’ অজুহাতে তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আখমাদ তাঙ্গিয়েভ: স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ফোরতাঙ্গা’র মতে, ১২ মে এফএসবি উইসাম বার্দভিলের এই ডেপুটি ও ধর্মযাজককে আটক করে।
রয়াল আসেনভ: মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের এই মুফতিকে গত ১৯ মে ঘুষ চাওয়ার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়।
মুহাম্মদ খেনি ও আল-খেইখ নিদাল: মুসলিম কমিউনিটি অব দ্য নর্থওয়েস্টের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খেনিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে তাঁর এক আত্মীয় এবং সারাতভ অঞ্চলের ডেপুটি মুফতি আল-খেইখ নিদাল আওয়াদুল্লাহ আহমদের সঙ্গে আটক করা হয়। এছাড়াও তাতারস্তান ও মারমানস্কের আরও চারজন প্রতিনিধিকে আটকের খবর মিলেছে।
রাশিয়ার প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ‘কোমেরসান্ত’ ও প্রভাবশালী টিভি প্রচারক রুসলান অস্তাশকো দাবি করেছেন—আদালতের নথি অনুযায়ী আটককৃতদের অনেকের বিরুদ্ধে রাশিয়ার নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) হয়ে কাজ করার সন্দেহজনক অভিযোগ আনা হয়েছে। উগ্র ডানপন্থি রুশ চ্যানেল ‘সন্স অব মনার্কি’ এই গ্রেফতারকে স্বাগত জানিয়ে একে ক্রেমলিন-সমর্থিত ‘স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস’ (DUM) ভেঙে দেওয়ার অভিযানের সূচনা বলে উল্লাস প্রকাশ করেছে।
সবচেয়ে আলোচিত মামলাটি সামনে আসে গত ২৯ মে, যার শিকার হন ডিইউএম-এর ফার্স্ট ডেপুটি দামির মুখেতদিনভ। তাঁর বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা বা শত্রুতা উসকে দেওয়ার’ অভিযোগ এনে মস্কো আদালত ১ লাখ ৫০ হাজার রুবল জরিমানা করেন।
ঘটনার নেপথ্যে ছিল মুখেতদিনভের কার্যালয়ের দেয়ালে ঝুলানো ‘মঙ্গোল-তাতার যুগ’ শীর্ষক একটি ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম, যা ১২২৩ সালের কালকা যুদ্ধকে চিত্রিত করে। কট্টর রুশ জাতীয়তাবাদীরা এই চিত্রকর্মটিকে ‘রাশিয়া-বিরোধী’ ও চরমপন্থার প্রতীক আখ্যা দিয়ে হইচই শুরু করে। মুখেতদিনভ প্রথমে যুক্তি দেন যে, মঙ্গোল সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি ‘গোল্ডেন হোর্ড’ বহুজাতিক ও বহু-ধর্মীয় রাশিয়ার বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু উগ্রপন্থিদের তীব্র চাপের মুখে পরবর্তীতে তিনি চিত্রকর্মটি সরিয়ে সেখানে নাজি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধের’ ছবি স্থাপন করতে বাধ্য হন।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন প্রশাসন রাশিয়ার পরিচয়কে একটি ‘ঐতিহাসিক, আধ্যাত্মিক ও স্লাভিক পরিসর’-এ সংগঠিত করার চেষ্টা করছে, যেখানে ভিন্ন জাতিগত বা ইসলামি ইতিহাসের নিজস্ব বয়ানের কোনো স্থান নেই।
এদিকে মে মাসের শুরুতে ডিইউএম প্রধান মুফতি রাভিল গাইনুতদিন খোদ প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাশিয়ার পার্লামেন্টে শাসক দলের শীর্ষ নেতাদের সমর্থনে একটি বিল আনা হয়েছে—যার মাধ্যমে আবাসিক ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টে যেকোনো ধরণের ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতবদ্ধ নামাজ পড়া কার্যত নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে।
মুফতি গাইনুতদিন চিঠিতে সতর্ক করে বলেন, “এর মানে হলো কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়লেও তা আইন লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে, যা উপাসনার সাংবিধানিক অধিকারের চরম পরিপন্থী।” তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়ায় মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত মসজিদের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও নতুন মসজিদ বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বরাবরই অনীহা দেখায়; এর ওপর ঘরের ভেতর নামাজ পড়ার অধিকার কেড়ে নিলে তা চরমপন্থাকে আরও উসকে দেবে।
ভিয়েনা ও ইউরোপের নির্বাসিত গণমাধ্যম ‘নোভায়া গাজেতা ইউরোপা’র মতে, এই বিলটির পেছনে একটি গভীর ‘অভিবাসীবিরোধী প্রবণতা’ লুকিয়ে রয়েছে। ২০২৩ সাল থেকেই রাশিয়ার বিভিন্ন উপাসনালয় ও মসজিদে পুলিশি অভিযান চালিয়ে মধ্য এশীয় মুসলিম অভিবাসীদের ধরে সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক নিবন্ধন ও নিয়োগ অফিসে পাঠানোর নজির রয়েছে।
এত বড় ঘটনার পরও রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (DUM) বা মূলধারার মুসলিম সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক ভূমিকা ছিল দায়সারা ও নীরব। গত ৮ জুন ডিইউএম-এর প্রধান রাভিল গাইনুতদিন এক বিবৃতিতে বলেন, “ডিইউএম-কে চরমপন্থার কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপনের মিডিয়া চেষ্টা বিভাজন তৈরি করছে এবং বাহ্যিক প্রতিপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করছে।” তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, নিজের বিবৃতিতে তিনি তাঁর সহকর্মীদের গ্রেফতার বা প্রশাসনিক জরিমানার বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি এবং ফেডারেল কর্তৃপক্ষের সাথে আপস করে চলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রাশিয়ায় বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি মুসলিমের বাস, যা ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে একক বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর চেচনিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ দমনের পর, পুতিন চেচেন নেতা রমজান কাদিরভের মতো অনুগতদের ক্ষমতায় বসিয়ে এবং বড় বড় মসজিদ নির্মাণে অর্থায়ন করে একটি ‘ধর্মীয় সম্প্রীতির’ মুখোশ ধরে রেখেছিলেন। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার মুসলিম সমাজ ও আলেম সমাজ ক্রেমলিনকে জান-মাল দিয়ে সমর্থন করে আসছে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে ক্রেমলিনের আদর্শিক অবস্থান সম্পূর্ণভাবে ‘অর্থোডক্স রাশিয়া’ বা কট্টর খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। স্বাধীন সংস্থা ‘দক্সা’ (Doxa)-এর এক ইসলামি বিশারদ জানান, “অতীতে রাশিয়ায় মুসলিমদের রাজনৈতিক আনুগত্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সেই আনুগত্যের সংজ্ঞা বদলে গেছে। এখন স্লাভিক জাতীয়তাবাদের জোয়ারে মুসলিম নাগরিকদের ওপর সন্দেহ ও ইসলামবিদ্বেষ এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।” মে মাসের এই সাঁড়াশি অভিযান সেই গভীর সংকটেরই একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |