সংসদ ও অর্থ প্রতিবেদক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬
দীর্ঘ ১৯ বছর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার আজ তাদের প্রথম বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া এক দুর্বল, চরম মূল্যস্ফীতির চাপগ্রস্ত এবং পুঞ্জীভূত নানা সংকটে জর্জরিত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই ঐতিহাসিক বাজেট উপস্থাপন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সশরীরে উপস্থিতিতে বর্তমান অন্তর্বর্তী ও দলীয় সংস্কারের আবহে এই মেগা বাজেটটি পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর আগে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন, “দেশের কোনো বিশেষ গোষ্ঠী নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কথা মাথায় রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক ক্ষত নিয়ে প্রতিটি মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান ও এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হবে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি (Inflation) কমিয়ে এনে বাজারে স্বস্তি ফেরানো এবং রাজস্ব আহরণের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, সেটি সফল করা।
এছাড়া বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে বিগত দিনে আস্থাহীনতায় থাকা দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনা, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দেওয়াও নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে সরকারের অর্থ বিভাগে শুধু ভর্তুকির জন্যই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বিশাল চাহিদার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক চাপ ও ভর্তুকির বোঝা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাষ্ট্রের বিশাল ব্যয়ের অর্থ জোগাতে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা—যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর খাতওয়ারী রূপরেখা হলো:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) থেকে: ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআর বহির্ভূত খাত থেকে: ২৫ হাজার কোটি টাকা।
কর বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের খাত থেকে: ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে এই বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বড় ঘাটতি রাখা হয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ এবং বৈদেশিক ঋণ-সহায়তার ওপর চরমভাবে নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে কেবল দেশের ব্যাংকিং খাত থেকেই ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ সংগ্রহের এক ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা করেছে সরকার।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “জিডিপির বৃদ্ধির গতি শ্লথ, প্রাইভেট বিনিয়োগে মন্দা, রফতানি প্রবৃদ্ধি মাইনাস দুই শতাংশ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি (LC) খোলার হার নেতিবাচক—এমন অনেক বড় সংকটের মধ্যে বাজেট আসছে। তবে জনগণের কাছে দেওয়া বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং ঋণের সুদের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলে অর্থনীতিকে সচল করাই হবে প্রধান পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ।”
দুর্বল অর্থনীতি ও নানাবিধ চ্যালেঞ্জের পরেও জনমনে স্বস্তি ফেরাতে এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে এবারের বাজেটে বেশ কিছু চমকপ্রদ ও কল্যাণমুখী সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে:
ব্যবসায় ‘বাংলাবিজ’ ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস: ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মাত্র ৭ দিনের মধ্যে লাইসেন্স পাওয়ার নিশ্চয়তাসহ ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর ঘোষণা আসছে।
অনলাইন এনবিআর ও ট্যাক্স রিফান্ড: কর রিটার্ন সম্পূর্ণ অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত (ট্যাক্স রিফান্ড) এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আধুনিক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব থাকছে।
২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’: স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটালাইজেশনে দেশের প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর: সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস-এর তথ্য অনুযায়ী, আজকের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন সরকারি বেতন কাঠামোর (পে স্কেল) আংশিক বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
উদ্যোক্তা ও এসএমই তহবিল: দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতের বিকাশের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড: প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নতুন করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ যুক্ত করাসহ বিদ্যমান বরাদ্দ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এখন দেখার বিষয় হলো, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের ক্রমবর্ধমান পাহাড়সম চাপ এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে দিতে হওয়া বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি সামলে দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) গতি চাঙ্গা করতে তারেক রহমানের নতুন সরকার বাজেটে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের বাস্তবমুখী ও কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |