| বঙ্গাব্দ

২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 01-06-2026 ইং
  • 2940 বার পঠিত
২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ছবির ক্যাপশন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের মারাত্মক আসক্তি থেকে সুরক্ষিত রেখে একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (৩১ মে) ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ পোস্টে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া কঠোর আইনি পদক্ষেপগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. তামাকের স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, টোব্যাকো এটলাস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশে তামাকের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি ও মৃত্যুর এক উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন:

  • ৭১% মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ: বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ হলো বিড়ি, সিগারেট, ই-সিগারেট, জর্দা ও গুলের মতো তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার।

  • বার্ষিক মৃত্যু ২ লাখের কাছাকাছি: ‘টোব্যাকো এটলাস ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ লাখ ৯৯ হাজারের বেশি মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হন।

  • ৮৭ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, তামাক ব্যবহারের ফলে পরিবেশগত ক্ষতি, চিকিৎসাব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসসহ দেশের অর্থনীতিতে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

২. শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় বিজ্ঞাপনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা

তামাক কোম্পানিগুলোর সুকৌশলী প্রলোভন থেকে শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে সরকার সব মাধ্যমে তামাকের প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে:

  • ডিজিটাল ও গণমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা: প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপস, ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম এবং নাটক-সিনেমাসহ সব ধরনের মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

  • সিএসআর (CSR) আড়ালে প্রচারণা বন্ধ: করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর-এর আড়ালে তামাক কোম্পানিগুলো যাতে কোনো প্রকার পরোক্ষ প্রচার-প্রচারণা চালাতে না পারে, আইনি संशोधনীতে তাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

৩. তামাক বিক্রয় ও সেবনের ক্ষেত্রে নতুন আইনি বিধিনিষেধ

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ ২০০৩ সালে এফসিটিসিতে (FCTC) স্বাক্ষর, ২০০৪ সালে অনুসমর্থন এবং ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে। এরই ধারাবাহিকতায় আইনটিকে আরও শক্তিশালী করতে বেশ কিছু নতুন বিধিবিধান ও শাস্তির পরিধি বাড়ানো হয়েছে:

  1. ১০০ মিটারের মধ্যে বিক্রি নিষিদ্ধ: দেশের যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান এবং শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা যাবে না।

  2. ১৮ বছরের নিচে নিষেধাজ্ঞা: ১৮ বছরের কম বয়সী বা নাবালকদের কাছে তামাক ও নিকোটিনযুক্ত পণ্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

  3. পাবলিক প্লেসে ধূমপান মুক্ত: সাধারণ মানুষের পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে বাঁচাতে সব ধরনের পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই সাথে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

৪. এক নজরে বাংলাদেশে তামাকের প্রভাব ও আইনি ফ্রেমওয়ার্ক

বাংলাদেশে তামাকের সার্বিক প্রভাব এবং এটি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ম্যাট্রিক্স নিচে তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব
  • উচ্চ ব্যবহার হার: দেশের প্রায় ৩৫.৩% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ) যেকোনো উপায়ে (ধূমপান বা ধোঁয়াবিহীন) তামাক ব্যবহার করেন।
  • পরোক্ষ ধূমপান: গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র ও রেস্তোরাঁয় প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত পরোক্ষ ধূমপানের (Second-hand smoke) শিকার হন।
  • অর্থনৈতিক ক্ষতি: তামাক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসার ব্যয় দেশের মোট জিডিপি (GDP)-র প্রায় ১.৪% ক্ষয় করে।
  • কৃষিতে ক্ষতি: তামাক চাষের কারণে দেশের উর্বর কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে এবং মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির মারাত্মক দূষণ ঘটছে। 
বিদ্যমান আইনি ফ্রেমওয়ার্ক (তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন)
বাংলাদেশে প্রধান আইনি কাঠামো হলো 'ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫' (যা ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়)। এর মূল ধারাগুলো হলো: 
  • পাবলিক প্লেসে নিষেধাজ্ঞা: সব ধরনের গণপরিবহন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রেস্তোরাঁসহ পাবলিক প্লেসে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। 
  • বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপ নিষিদ্ধ: টিভি, রেডিও, খবরের কাগজ, সিনেমা বা ইন্টারনেটে তামাকজাত দ্রব্যের যেকোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিজ্ঞাপন এবং প্রচারণা সম্পূর্ণ বেআইনি।
  • সচিত্র সতর্কবার্তা: তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের উপরিভাগের ন্যূনতম ৫০% অংশে তামাকের কারণে সৃষ্ট রোগের ছবিসহ সংবিধিবদ্ধ সতর্কবার্তা মুদ্রণ করা বাধ্যতামূলক। 
  • নাবালকদের কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ: ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যক্তির কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা বা তাদের দিয়ে তামাকের ব্যবসা করানো দণ্ডনীয় অপরাধ। 
আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনীর বর্তমান অবস্থা
বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও ই-সিগারেটের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং কিছু আইনি দুর্বলতার কারণে আইনটি পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বর্তমানে আইনটি আরও শক্তিশালী করতে একটি খসড়া সংশোধনী প্রস্তুত করেছে, যার মূল বিষয়গুলো হলো: 
  • ই-সিগারেট নিষিদ্ধকরণ: ভ্যাপিং ও ই-সিগারেট (E-cigarette) উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
  • ধূমপান এলাকার বিলুপ্তি: পাবলিক প্লেস ও রেস্তোরাঁয় থাকা 'নির্দিষ্ট ধূমপান এলাকা' বা 'ডিএসএ' (Designated Smoking Area) প্রথা পুরোপুরি বাতিল করা।
  • খুচরা বিক্রি বন্ধ: তামাকের ব্যবহার কমাতে একটি বা দুটি করে খুচরা সিগারেট বা বিড়ি বিক্রি নিষিদ্ধ করে পুরো প্যাকেট কেনা বাধ্যতামূলক করা।
  • সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধি: প্যাকেটের সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৯০% করা। 

প্রধানমন্ত্রী তাঁর পোস্টের শেষাংশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এই নতুন বিধিবিধানগুলোর মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালটেন্ট ও কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন:বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency