| বঙ্গাব্দ

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের শান্তি আলোচনা: হরমুজ প্রণালী ও পারমাণবিক শর্তে অচলাবস্থা

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 30-05-2026 ইং
  • 7290 বার পঠিত
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের শান্তি আলোচনা: হরমুজ প্রণালী ও পারমাণবিক শর্তে অচলাবস্থা
ছবির ক্যাপশন: ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তার মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় সেটি আরও বাড়ানো যায় কিনা—তা নিয়ে বর্তমানে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ট্রাম্পের দেওয়া দুটি মূল শর্তে ইরান এখনও একমত হতে না পারায় চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি আটকে আছে।

চলমান এই আন্তর্জাতিক সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং হোয়াইট হাউস ও তেহরানের মধ্যকার রেষারেষির মূল বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুম’ বৈঠক ও ট্রাম্পের দুই শর্ত

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে স্থায়ী চুক্তির পথ সুগম করতে ইরান একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘সিচুয়েশন রুমে’ (Situation Room) প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। তবে বৈঠক থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা এবং স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে মূলত দুটি কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে:

  • হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার: ট্রাম্পের প্রথম শর্ত হলো—হরমুজ প্রণালীর ওপর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে, অবিলম্বে প্রণালীটি উন্মুক্ত করতে হবে এবং সেখানে যুদ্ধের আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে হবে। এছাড়া সেখান দিয়ে চলাচলের জন্য কোনো শুল্ক বা টোল আদায় করা যাবে না।

  • পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ বন্ধ: দ্বিতীয় এবং অপরিবর্তনীয় শর্ত হলো—ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সুযোগ রাখা যাবে না। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, "ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র বা বোমা বানাতে পারবে না—এ বিষয়ে তাদের সম্মত হতেই হবে।" এমনকি ইরান থেকে মাটি খুঁড়ে পারমাণবিক সামগ্রী বের করে আনার দাবিও করেছেন তিনি।

২. তেহরানের অনমনীয় অবস্থান ও মার্কিন অবরোধের শর্ত

যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা শর্তের মুখে তেহরান এখন পর্যন্ত কোনোটিতেই রাজি হয়নি এবং তাদের নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে।

  • যুদ্ধে ‘জয়’ দেখানোর চেষ্টা: ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স দাবি করেছে যে, ট্রাম্পের এই ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য মূলত বিশ্ববাসীর কাছে যুদ্ধে নিজের ‘জয়’ দেখানোর একটি রাজনৈতিক চেষ্টা মাত্র।

  • হরমুজ প্রণালীর সার্বভৌমত্ব: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের নিয়ন্ত্রণ কেবল ইরান ও ওমানের হাতে থাকা উচিত। অন্য কোনো বিদেশি শক্তির এখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।

  • মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি: তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানি জাহাজের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, তা সম্পূর্ণ না উঠলে এই প্রণালী কোনোভাবেই খুলে দেওয়া হবে না।

৩. সমঝোতার সূত্র: কোন পক্ষ কতটা ছাড় দেবে?

চলমান এই অচলাবস্থার মধ্যে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একটি সম্ভাব্য সমঝোতার সূত্র ইঙ্গিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী থেকে তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রও তার বিনিময়ে ধীরে ধীরে ইরানি জাহাজের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করা শুরু করবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই পক্ষ নিজেদের দাবিতে অনড় থাকে নাকি আলোচনার টেবিলে কিছুটা ছাড় দিতে রাজি হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তি।

ট্রাম্প বনাম ইরান: শান্তি আলোচনার মূল দ্বন্দ্বসমূহ

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনার মূল দ্বন্দ্বসমূহ মূলত নিরাপত্তা, ভূ-রাজনীতি, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক অবরোধের ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হচ্ছে । ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সরাসরি সামরিক সংঘাত ও পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর, স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের প্রধান অমিলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো 
১. পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম মজুদ (Nuclear Stockpile)
  • ট্রাম্পের দাবি: ইরানকে স্থায়ীভাবে পরমাণু অস্ত্র বা বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত থাকতে হবে [১.৩.৭]। বর্তমান শান্তি চুক্তির শর্ত হিসেবে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের কাছে থাকা ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের (প্রায় ৪৪০ কেজি) পুরো মজুদ হয় ধ্বংস করতে হবে, না হয় তা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে দেশের বাইরে (যেমন কাজাখস্তানে) সরিয়ে নিতে হবে 
  • ইরানের অবস্থান: ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে সার্বভৌম অধিকার বলে মনে করে। সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ বা মজুদ হাতছাড়া করার চেয়ে তারা শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি দিতে আগ্রহী 
২. হরমুজ প্রণালী ও নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ (Strait of Hormuz Crisis)
  • ট্রাম্পের দাবি: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কোনো ধরনের শুল্ক বা ফি ছাড়াই আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে এবং সেখানে পাতা সব সামুদ্রিক মাইন ধ্বংস করতে হবে 
  • ইরানের অবস্থান: ইরান এবং ওমান যৌথভাবে এই প্রণালীর ব্যবস্থাপনা ও রুট নিয়ন্ত্রণ করতে চায় [১.৩.৩]। ইরান দাবি করছে যে, যুদ্ধবিরতি পরবর্তী সময়ে এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট 'পরিষেবা ফি' বা টোল আদায়ের অধিকার তাদের রয়েছে 
৩. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বনাম নৌ-অবরোধ (Sanctions & Blockade)
  • ইরানের দাবি: স্থায়ী শান্তিতে আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপানো সব কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজড অ্যাসেট বা সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে 
  • ট্রাম্পের দাবি: ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমে আংশিক বা ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পক্ষে, যাতে ইরান চুক্তির শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে চলছে কিনা তা নিশ্চিত করা যায় । শর্ত পূরণের আগে সব নিষেধাজ্ঞা একবারে তোলার বিরোধী ওয়াশিংটন।
৪. ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপ (Missile Program & Proxies)
  • ট্রাম্পের দাবি: মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরিকারী বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোকে (যেমন হিজবুল্লাহ, হুথি ইত্যাদি) ইরান কর্তৃক অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হবে 
  • ইরানের অবস্থান: ইরান তাদের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন দেওয়াকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বজায় রাখতে চায়
৫. গভীর অবিশ্বাস ও গ্যারান্টির সংকট (Trust Deficit)
  • উভয় পক্ষের সংকট: ইরানের প্রধান আলোচকদের মতে, আমেরিকার মুখের কথা বা লিখিত গ্যারান্টির ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই, কারণ অতীতে (২০১৮ সালে) ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে একতরফাভাবে বের হয়ে গিয়েছিলেন । ফলে ইরান এবার আগে 'আমেরিকার দৃশ্যমান পদক্ষেপ' দেখতে চায় । অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের আশঙ্কা, চুক্তির সুযোগ নিয়ে ইরান গোপনে তাদের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করবে 
বর্তমানে একটি সাময়িক খসড়া শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (MOU) নিয়ে আলোচনা চললেও এই মৌলিক বিষয়গুলোতে চূড়ান্ত ঐকমত্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত চুক্তিটি ঝুলে রয়েছে 

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, ট্রাম্প এবং তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান মূলত আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি 'ব্লিঙ্ক গেম' (Blink Game)। ট্রাম্প তাঁর চিরপরিচিত 'ডিল-মেকিং' স্টাইলে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করছেন, যেখানে তিনি ইরানকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র এবং হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন মিত্রদের জন্য উন্মুক্ত দেখতে চান। অন্যদিকে ইরান ভালো করেই জানে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণই তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র (Leverage)। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের অবরোধ প্রত্যাহারের ইঙ্গিতটি প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে একটি মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে। তবে ইরান তাদের পারমাণবিক সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত না করে ট্রাম্পের এই অপমানজনক শর্তে সই করবে বলে মনে হয় না। আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency