মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬: ইসরাইলের ক্রমাগত বিমান ও স্থল হামলা, কঠোর সীমান্ত অবরোধ এবং উপর্যুপরি নির্মম বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজা উপত্যকার গবাদিপশু ($Livestock$) খাত এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এক সময়ের স্বনির্ভর এই উপত্যকার লাখ লাখ মুসলমান পরিবার টানা তৃতীয় বছরের মতো পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপন করা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন।
দীর্ঘদিনের ধর্মীয়, সামাজিক ও আত্মিক এই ঐতিহ্যটি এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাবাসীর জীবন থেকে চিরতরে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে গাজা সিটির অন্যতম শীর্ষ গবাদিপশু খামারি ছিলেন মাজেন আল-জেরজাউই। বছরের এই বিশেষ সময়ে তিনি কোরবানি উপলক্ষে শত শত গরু, ভেড়া ও ছাগল বিক্রি করার ব্যস্ত প্রস্তুতি নিতেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি চরম বেদনাদায়ক। জেরজাউই এখন কোনোমতে বেঁচে থাকার জন্য একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালান, যেখানে ইসরাইলি কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে উপত্যকায় প্রবেশ করা হিমায়িত (ফ্রোজেন) মাংসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আল-জেরজাউই জানান:
"বছরের এই সময়ে আমি প্রায় ২০০টি গরু ও ভেড়া বিক্রি করতাম, অথচ আজ আমার কাছে একটি পশুও নেই। ইসরাইল গাজায় কোনো জীবন্ত পশু প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তারা গাজার মানুষকে এমনভাবে দেখছে যেন তারা এখানে সাময়িক সময়ের জন্য কোনো শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে এবং জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই সরবরাহ করা হচ্ছে।"
সাধারণত ঈদুল আজহার সময় গাজায় কোরবানির পশুর ব্যাপক চাহিদা থাকে। যুদ্ধের আগে এই অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। কিন্তু টানা আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ও সর্বগ্রাসী অবরোধের কারণে এবারও সেই চেনা ধর্মীয় উৎসবের দৃশ্য ফিরছে না। গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলা এবং পশুখাদ্য ও কৃষি সরঞ্জামের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
তীব্র পশু সংকটের কারণে গাজার স্থানীয় বাজারে গবাদিপশুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে—আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে গাজায় একটি সাধারণ ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। বর্তমানে সেই একই ভেড়া কিনতে ক্রেতাদের গুণতে হচ্ছে প্রায় ৭,০০০ মার্কিন ডলার (যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ২০,০০০ শেকেল)।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ($FAO$) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেই গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে। পশুপাখির পাশাপাশি খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম এবং ভেটেরিনারি ক্লিনিকগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। বোমাবর্ষণের কারণে যেমন অসংখ্য পশু মারা গেছে, তেমনি বারবার এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে বেঁচে থাকা পশুদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় সস্তায় বা স্রেফ পরিবারের জন্য সামান্য ময়দা কেনার জন্য পানির দামে পশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন খামারিরা।
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানিয়েছেন, বর্তমানে যে সামান্য কিছু ছাগল-ভেড়া বেঁচে আছে, তা যাযাবর রাখালদের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো বিক্রির জন্য নয়। পানি তোলার পাম্প বা কূপগুলো সচল না থাকায় এই খাতটি পুনরুজ্জীবিত করারও কোনো সুযোগ নেই।
কোরবানির এই অনুপস্থিতি গাজার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা জানান, দীর্ঘ তিন বছর ধরে তারা কোনো ঈদ উদযাপন করতে পারছেন না। কোরবানির আনন্দ এবং তা প্রতিবেশীদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার যে অনুভূতি, সেটি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। গাজার অধিকাংশ পরিবারের এখন তিন বেলার খাবার জোগাড় করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রোজেন মাংসের স্বাদ পর্যন্ত পাননি।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও এসইও এক্সপার্ট হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের এই মানবিক সংকটগুলো পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে। গবাদিপশু খাতের এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব বন্ধ করেনি, বরং এর সাথে জড়িত পশুচিকিৎসক, খামারি, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ পুরো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। স্বনির্ভর হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে গাজাকে পরনির্ভরশীল করে রাখাই এই দীর্ঘমেয়াদী অবরোধের মূল লক্ষ্য।
জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি ($IPC$) মূল্যায়নে দেখা গেছে, গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর ইসরাইলের কঠোর ও অনিয়মিত নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। উৎসবের আনন্দ যেখানে মলিন, সেখানে গাজাবাসীর এখন একমাত্র লড়াই—স্রেফ বেঁচে থাকা।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |