| বঙ্গাব্দ

গাজায় গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস: টানা ৩ বছর কোরবানি ছাড়াই কাটছে ঈদ

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-05-2026 ইং
  • 15685 বার পঠিত
গাজায় গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস: টানা ৩ বছর কোরবানি ছাড়াই কাটছে ঈদ
ছবির ক্যাপশন: গাজায় গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস

নিষ্পাপ শৈশব ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর আঘাত: গাজায় গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস, টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানি ছাড়াই কাটছে ঈদ

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬: ইসরাইলের ক্রমাগত বিমান ও স্থল হামলা, কঠোর সীমান্ত অবরোধ এবং উপর্যুপরি নির্মম বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজা উপত্যকার গবাদিপশু ($Livestock$) খাত এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এক সময়ের স্বনির্ভর এই উপত্যকার লাখ লাখ মুসলমান পরিবার টানা তৃতীয় বছরের মতো পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপন করা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন।

দীর্ঘদিনের ধর্মীয়, সামাজিক ও আত্মিক এই ঐতিহ্যটি এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাবাসীর জীবন থেকে চিরতরে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

১. খামারিদের আর্তনাদ ও জীবন্ত পশুর ওপর ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞা

যুদ্ধ শুরুর আগে গাজা সিটির অন্যতম শীর্ষ গবাদিপশু খামারি ছিলেন মাজেন আল-জেরজাউই। বছরের এই বিশেষ সময়ে তিনি কোরবানি উপলক্ষে শত শত গরু, ভেড়া ও ছাগল বিক্রি করার ব্যস্ত প্রস্তুতি নিতেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি চরম বেদনাদায়ক। জেরজাউই এখন কোনোমতে বেঁচে থাকার জন্য একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালান, যেখানে ইসরাইলি কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে উপত্যকায় প্রবেশ করা হিমায়িত (ফ্রোজেন) মাংসের ওপর নির্ভর করতে হয়।

তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আল-জেরজাউই জানান:

"বছরের এই সময়ে আমি প্রায় ২০০টি গরু ও ভেড়া বিক্রি করতাম, অথচ আজ আমার কাছে একটি পশুও নেই। ইসরাইল গাজায় কোনো জীবন্ত পশু প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তারা গাজার মানুষকে এমনভাবে দেখছে যেন তারা এখানে সাময়িক সময়ের জন্য কোনো শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে এবং জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই সরবরাহ করা হচ্ছে।"

সাধারণত ঈদুল আজহার সময় গাজায় কোরবানির পশুর ব্যাপক চাহিদা থাকে। যুদ্ধের আগে এই অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। কিন্তু টানা আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ও সর্বগ্রাসী অবরোধের কারণে এবারও সেই চেনা ধর্মীয় উৎসবের দৃশ্য ফিরছে না। গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলা এবং পশুখাদ্য ও কৃষি সরঞ্জামের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

২. চড়া দাম ও গবাদিপশুর চরম বিলুপ্তি: এফএও-র ভয়াবহ পরিসংখ্যান

তীব্র পশু সংকটের কারণে গাজার স্থানীয় বাজারে গবাদিপশুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে—আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে গাজায় একটি সাধারণ ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। বর্তমানে সেই একই ভেড়া কিনতে ক্রেতাদের গুণতে হচ্ছে প্রায় ৭,০০০ মার্কিন ডলার (যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ২০,০০০ শেকেল)।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ($FAO$) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেই গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে। পশুপাখির পাশাপাশি খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম এবং ভেটেরিনারি ক্লিনিকগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। বোমাবর্ষণের কারণে যেমন অসংখ্য পশু মারা গেছে, তেমনি বারবার এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে বেঁচে থাকা পশুদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় সস্তায় বা স্রেফ পরিবারের জন্য সামান্য ময়দা কেনার জন্য পানির দামে পশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন খামারিরা।

গাজা উপত্যকার গবাদিপশু খাতের বর্তমান চিত্র (পরিসংখ্যান)

গাজা উপত্যকার গবাদিপশু (প্রাণিসম্পদ) খাতটি দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অবিরাম যুদ্ধ, কঠোর অবরোধ এবং পশুখাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি ধ্বংস হয়ে গেছে বোমাবর্ষণ, খামার ধ্বংস এবং বারংবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির কারণে গজার ঐতিহ্যবাহী এই খাতটি বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। 
জাতিসংঘের খাদ্য ও कृषि সংস্থা (FAO), ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং গাজা চেম্বার অব কমার্সের সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান ও চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো: 
গবাদিপশু সংকটের বর্তমান পরিসংখ্যান (মে ২০২৬)
  • পশুর সংখ্যায় ব্যাপক ধস: ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের আগে গাজায় যেখানে ৬০,০০০ ভেড়া ও ছাগল ছিল, তা বর্তমানে কমে মাত্র ৩,০০০-এ এসে ঠেকেছে।
  • গরু ও বাছুরের বিলুপ্তি: ডেইরি এবং মাংসের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত গরু ও বাছুর গাজা উপত্যকা থেকে বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ইসরায়েল কর্তৃক জীবন্ত পশু আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই ঘাটতি পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
  • আকাশচুম্বী দাম: তীব্র সংকটের কারণে বাজারে অবশিষ্ট পশুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। যুদ্ধের আগে গাজায় যে ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার, বর্তমানে তা ১৪ গুণ বেড়ে প্রায় ৭,০০০ ডলারে (২০,০০০ শেকেল) দাঁড়িয়েছে।
  • কোরবানি ও ধর্মীয় উৎসবে স্থবিরতা: যুদ্ধের আগে কোরবানি উপলক্ষে গাজায় প্রতি বছর ৪০ থেকে ৬০ হাজার গবাদিপশু আমদানি করা হতো। তবে বর্তমান বাস্তবতায় টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় কোরবানি উৎসব সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। 
অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি
  • অবকাঠামো ধ্বংস: উপত্যকার অধিকাংশ পশুপালন খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম এবং ভেটেরিনারি ক্লিনিকগুলো বোমাবর্ষণে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
  • পানির অভাব: পানি তোলার পাম্প ও কূপগুলো সচল না থাকায় অবশিষ্ট পশুদের বাঁচিয়ে রাখা বা খামার পুনরুজ্জীবিত করার কোনো সুযোগ নেই।
  • বাধ্যতামূলক পানির দামে বিক্রি: জীবন বাঁচাতে খামারিরা যখন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পালিয়েছেন, তখন পশুপাল সাথে নেওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে স্রেফ সামান্য ময়দা বা আটা কেনার জন্য খামারিরা তাদের পশুগুলো পানির দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। 
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বর্তমান ট্রেন্ড
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সংকটের মধ্যেও গাজার অবশিষ্ট পশুপালকদের টিকিয়ে রাখতে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে: 
  • পশুখাদ্য বিতরণ: ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ফাও (FAO) গাজায় প্রায় ১,৮০০ মেট্রিক টন পশুখাদ্য এবং ২,৩০০টি ভেটেরিনারি কিট বিতরণ করেছে।
  • সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন (ছোট গবাদিপশু): মে ২০২৬-এ প্রকাশিত ফাও-এর ট্র্যাকিং অনুযায়ী, পশুখাদ্য ও ইনপুট সহায়তার কারণে গত কয়েক মাসে গাজায় বেঁচে থাকা ছোট গবাদিপশুর মধ্যে ভেড়ার সংখ্যা ৩৩% এবং ছাগলের সংখ্যা ৮% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মূলত পারিবারিক পর্যায়ে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের জোগান দিচ্ছে। 

৩. সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জীবনে গভীর ক্ষত

গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানিয়েছেন, বর্তমানে যে সামান্য কিছু ছাগল-ভেড়া বেঁচে আছে, তা যাযাবর রাখালদের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো বিক্রির জন্য নয়। পানি তোলার পাম্প বা কূপগুলো সচল না থাকায় এই খাতটি পুনরুজ্জীবিত করারও কোনো সুযোগ নেই।

কোরবানির এই অনুপস্থিতি গাজার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা জানান, দীর্ঘ তিন বছর ধরে তারা কোনো ঈদ উদযাপন করতে পারছেন না। কোরবানির আনন্দ এবং তা প্রতিবেশীদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার যে অনুভূতি, সেটি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। গাজার অধিকাংশ পরিবারের এখন তিন বেলার খাবার জোগাড় করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রোজেন মাংসের স্বাদ পর্যন্ত পাননি।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও এসইও এক্সপার্ট হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের এই মানবিক সংকটগুলো পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে। গবাদিপশু খাতের এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব বন্ধ করেনি, বরং এর সাথে জড়িত পশুচিকিৎসক, খামারি, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ পুরো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। স্বনির্ভর হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে গাজাকে পরনির্ভরশীল করে রাখাই এই দীর্ঘমেয়াদী অবরোধের মূল লক্ষ্য।

৪. চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ১৬ লাখ মানুষ

জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি ($IPC$) মূল্যায়নে দেখা গেছে, গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর ইসরাইলের কঠোর ও অনিয়মিত নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। উৎসবের আনন্দ যেখানে মলিন, সেখানে গাজাবাসীর এখন একমাত্র লড়াই—স্রেফ বেঁচে থাকা।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency