প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে জনমনে উদ্বেগ থাকলেও শিশু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৯৫ শতাংশই সুস্থ হয়ে উঠছে। তবে তাঁরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, হামের চেয়েও বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর হার অনেক বেশি। শুক্রবার (১৫ মে, ২০২৬) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দেশের শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন:
নিউমোনিয়ার ভয়াবহতা: দেশে বছরে প্রায় ২৪ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিশু এই রোগে প্রাণ হারাচ্ছে।
হামের বর্তমান অবস্থা: গত দুই মাসে (১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে) দেশে ৫৪ হাজার ৪১৯ জনের মধ্যে হাম ও এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ জন সরাসরি হামে এবং ৩৬৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
মৃত্যু হার: বাংলাদেশে হামে শিশু মৃত্যুর হার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা জানান, সফল টিকাদান কর্মসূচির কারণে ৯৫ শতাংশ শিশু ইতিমধ্যে টিকার আওতায় এসেছে।
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জিয়াউল হক জানান, গত দুই বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা ছেদ পড়ায় এ বছর মার্চ মাস থেকে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা সঠিক সময়ে টিকা দিলে প্রতিরোধ সম্ভব।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে শিশুরা পরবর্তীকালে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত শিশুদের ১ শতাংশের মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও সময়মতো চিকিৎসায় সুস্থ হওয়া সম্ভব।
অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন সংবাদ সম্মেলনে জানান, দেশে বর্তমানে ৫৬ শতাংশ শিশু মায়ের বুকের দুধ (Breastfeeding) পায়। বাকি ৪৪ শতাংশ শিশু মাতৃদুগ্ধের বাইরে থাকায় তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে। এছাড়া প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা শিশুদের নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হাম ও নিউমোনিয়ার এই লড়াই এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার বিবর্তন ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক দীর্ঘ যাত্রার সাক্ষী।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও মহামারী (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে হাম ও নিউমোনিয়া ছিল সাক্ষাৎ যম। তখন অ্যান্টিবায়োটিক বা ভ্যাকসিনের সহজলভ্যতা ছিল না। ১৯০০ সালের সেই সময়ে গ্রামীণ বাংলায় ওলাওঠা (কলেরা) ও বসন্তের মতো হামেও হাজার হাজার শিশু মারা যেত।
টিকাদান কর্মসূচির বিপ্লব (১৯৭১-১৯৯০): স্বাধীনতার পর আশির দশকে বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) শুরু হয়। ১৯০০ সালের সেই অন্ধকার আমল থেকে বেরিয়ে এসে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টিকাদানে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ও ২০২৬-এর নতুন স্বাস্থ্যনীতি: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরণের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের এই মে মাসে শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন হলে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনটি প্রমাণ করে যে, চিকিৎসকরা এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতা: ১৯০০ সালের সেই কবরেজ ও হাতুড়ে চিকিৎসকের আমল থেকে ২০২৬ সালের এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ মৃত্যুহার অনেক কমেছে। তবে নিউমোনিয়ার মতো ‘নীরব ঘাতক’ এখনো প্রতিদিন ৬০-৭০ জন শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, যা ২০২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
ইতিহাস সাক্ষী, রোগ প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার সবসময়ই কঠিন। ১৯০০ সালের সেই অসহায়ত্ব থেকে ২০২৬ সালের এই ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ—নিশ্চয়ই এক বিশাল অর্জন। তবে হামের আড়ালে নিউমোনিয়ায় প্রতিদিন এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ২০২৬ সালের জনস্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো বাড়ানো এবং প্যাকেটজাত খাবার বর্জন করা এখন সময়ের দাবি। ২০২৬ সালের এই মে মাসের সংবাদ সম্মেলনটি মূলত মা-বাবাদের সচেতন হওয়ার এক জোরালো আহ্বান।
সূত্র: ১. বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংবাদ সম্মেলন (১৫ মে, ২০২৬)।
২. ঐতিহাসিক দলিল: বাংলাদেশে শিশু স্বাস্থ্য ও টিকাদান কর্মসূচির ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |