জামায়াতের রাজনীতিতে ‘নতুন বন্দোবস্ত’: শরিয়াহ আইন ও কৌশলী অবস্থানের চুলচেরা বিশ্লেষণ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণই কোনো না কোনো নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি অধ্যায় আমাদের জাতিসত্তাকে শাণিত করেছে। তবে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সাম্প্রতিক ‘উদার’ ভঙ্গি এবং ‘শরিয়াহ আইন’ বাস্তবায়ন না করার আশ্বাস রাজনৈতিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গত বুধবার (১৪ জানুয়ারি, ২০২৬) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ন্যাশনাল খ্রিস্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাস সাংবাদিকদের জানান, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশে ‘শরিয়াহ ল’ বা শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্য নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, জামায়াত মূলত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো ও প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনার কথা বলেছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় নেতা মতিউর রহমান আকন্দ দাবি করেছেন, শরিয়াহ আইন হবে কি হবে না, তা মূলত জনগণের মতামতের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে।
১৯৪১ সালে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর হাত ধরে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি আদর্শিক আন্দোলন হিসেবে। ১৯৪৮ সালে ইসলামি সংবিধানের দাবিতে আন্দোলন এবং ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় দলটি চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। ১৯৭৯ সালে রাজনীতিতে ফেরার পর থেকে দীর্ঘ সময় দলটি ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করলেও ২০১২ সালে নির্বাচন কমিশনের শর্তপূরণে গঠনতন্ত্রে ব্যাপক সংশোধন আনে।
২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভের জন্য দলটি এখন ‘গুণগত পরিবর্তনের’ কথা বলছে। প্রথমবারের মতো দুইজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে সরব হওয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ‘নতুন বন্দোবস্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ উগ্রপন্থা পছন্দ করে না, যা জামায়াত এখন অনুধাবন করতে পেরেছে।
জামায়াতের এই অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি কি কেবলই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল? এই প্রশ্ন এখন তুঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসের মতে, নির্বাচনের আগে ভোটারদের বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতেই জামায়াত এ ধরনের ‘সফট’ বা নরম অবস্থান নিচ্ছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া এ অঞ্চলের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি এবং পরের বাস্তবতার মধ্যে অনেক সময়ই অমিল দেখা গেছে। জামায়াত এখন পর্যন্ত কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়া এবং নারীদের কর্মঘণ্টা নিয়ে আমিরের পূর্ববর্তী মন্তব্য দলটির ‘উদারবাদী’ ইমেজের সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন অনেকে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মানুষের সামনে এক বিশাল পরীক্ষা। জামায়াতে ইসলামী কি সত্যিই তাদের ১৯৪১ সালের মূল দর্শন থেকে সরে এসে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি চর্চা করবে, নাকি এটি কেবলই একটি সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল—তার উত্তর মিলবে ব্যালট বাক্সে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক প্রবাহে জামায়াতের এই বর্তমান অবস্থানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: ১. খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল ও জামায়াত আমিরের বৈঠকের প্রেস ব্রিফিং (১৪ জানুয়ারি, ২০২৬)। ২. জামায়াতে ইসলামীর সংশোধিত গঠনতন্ত্র (২০১২) ও হাই কোর্টের নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত নথি। ৩. রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের সাক্ষাৎকার ও কলাম।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |