প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
কলকাতা ও ঢাকা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম নামী প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন দুই ছাত্রীকে হিজাব খুলতে বাধ্য করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক। ইংরেজি বিভাগের প্রধান শাশ্বতী হালদারের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত তাকে দীর্ঘ ২৪ দিনের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তবে এই ঘটনা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গত ২২ ডিসেম্বর স্নাতক পরীক্ষার হল পরিদর্শনের সময় ইংরেজি বিভাগের প্রধান শাশ্বতী হালদার দুই ছাত্রীকে হিজাব খুলে তল্লাশি করেন। যদিও বিভাগীয় প্রধানের দাবি ছিল, এটি কেবল নকল ঠেকানোর একটি কৌশল, কিন্তু হিজাব খোলার পর কোনো নকল পাওয়া যায়নি। এর প্রতিবাদে ২৪ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ‘মাই বডি মাই চয়েস’ এবং ‘সে নো টু ইসলামোফোবিয়া’ লেখা পোস্টার নিয়ে প্রতিবাদ জানায়।
বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৭ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত শাশ্বতী হালদারকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য বিষয়টিকে 'ব্যক্তিগত ছুটি' হিসেবে বর্ণনা করলেও রাজনৈতিক মহলে এটি বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পোশাক এবং ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে মেরুকরণ নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়:
১৯০৫-১৯৪৭ (ব্রিটিশ আমল): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব পর্যন্ত, পোশাক ও পরিচয় সবসময়ই ছিল রাজনৈতিক ঢাল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে খদ্দরের কাপড় পরা যেমন প্রতিবাদের ভাষা ছিল, তেমনি ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় হিজাব বা টুপি ছিল আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
১৯৭১ (বাংলাদেশের স্বাধীনতা): বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু সেই সময়ও হানাদার বাহিনী ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্যাতন চালিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
২০২৪-২০২৬ (বর্তমান প্রেক্ষাপট): ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো মানুষের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা করা। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ভারত উভয় দেশেরই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা পোশাকের ওপর হস্তক্ষেপ সামাজিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে।
যাদবপুরের এই ঘটনার পর রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের সদস্যরা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করেছেন। সংখ্যালঘু অধিকার কর্মীদের মতে, "পরীক্ষায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি, কিন্তু তা যেন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত না করে।"
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকে শিক্ষাবিদগণ বলেছেন, "শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পোশাকের স্বাধীনতা থাকা উচিত। ২০২৬ সালের যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তরুণ প্রজন্ম দেখছে, সেখানে হিজাব বা যেকোনো ধর্মীয় পোশাক পরা নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা বা অসম্মান কাম্য নয়।"
যাদবপুরের ঘটনায় শাশ্বতী হালদারের ছুটি নেওয়ার বিষয়টি একটি অস্থায়ী সমাধান হতে পারে, কিন্তু এটি সামগ্রিক রাজনীতির একটি গভীর ক্ষতকে সামনে এনেছে। ১৯০০ সালের বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী সমাজ যেমন পরিচয় সংকটে ভুগেছে, ২০২৬ সালের দাঁড়িয়েও যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হিজাব বা ব্যক্তিগত পছন্দের পোশাক নিয়ে বিতর্ক হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে এই বিশ্লেষণটি তুলে ধরা হলো যে, ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই আগামীর রাজনীতিতে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষণ: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান 'ইসলামোফোবিয়া'র একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯০০ সাল থেকে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যে ধর্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় এসেও আধুনিকতার দোহাই দিয়ে তার অপব্যবহার বন্ধ হয়নি। এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন।
সূত্র: * যুগান্তর ও অনলাইন নিউজ ডেস্ক।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের প্রতিবেদন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সুপারিশপত্র (২০২৬)।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আর্কাইভ (১৯০০-১৯৭১)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |