নির্বাচন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা: কুমিল্লা-৪ আসনের দ্বন্দ্বে ইতিহাসের নতুন সমীকরণ
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের ভূমিকা বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। ২০২৬ সালের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে আজ ২ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার কুমিল্লা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এক নজিরবিহীন উত্তাপ লক্ষ্য করা গেছে। কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী ও এনসিপি (জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল)-এর দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মধ্যেও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অন্তরায়।
শুক্রবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, প্রশাসন বর্তমানে দ্বিচারিতামূলক আচরণ করছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী তার হলফনামায় ঋণ সংক্রান্ত এবং হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ সংক্রান্ত তথ্য গোপন করেছেন। হাসনাত আব্দুল্লাহর ভাষায়, "পর্যাপ্ত যুক্তি ও তথ্য থাকার পরেও একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল না করা প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ব্যক্তিগত তথ্য গোপন করলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান নির্বাচনী বিধিমালায় স্পষ্ট থাকলেও তা প্রয়োগ করা হয়নি।"
উল্লেখ্য, যাচাই-বাছাই চলাকালে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উভয় প্রার্থীর আইনজীবীদের মধ্যে প্রায় আধা ঘণ্টা বাগবিতণ্ডা চলে। তবে শেষ পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান দুজনেরই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে আইনগত প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পরিক্রমায় প্রশাসনের এই ‘ঝুঁকে পড়া’ বা ‘দলকানা’ নীতির ইতিহাস বেশ পুরনো।
১. ১৯৫০-এর দশক ও পাকিস্তান আমল: ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় থেকেই তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের অনুগত আমলারা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পর প্রশাসনকে পুরোপুরি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি শুরু হয়।
২. স্বাধীনতার পরবর্তী সময় (১৯৭৩-১৯৯০): ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনেও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল। পরবর্তীতে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনগুলো প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে রূপ নিয়েছিল।
৩. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে নিরপেক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হলেও ২০০৭ সালে (১/১১) সেটি মুখ থুবড়ে পড়ে। এরপর গত ১৫ বছরের শাসনামলে প্রশাসনের আমূল রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লক্ষ্যই ছিল প্রশাসনকে দলমুক্ত করা।
২০২৫ সালের পুরো সময়টি প্রশাসন সংস্কারের বছর হিসেবে পালিত হয়েছে। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুখে হাসনাত আব্দুল্লাহর এই অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—প্রশাসন কি তবে পুরাতন বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে?
নির্বাচনী নিরপেক্ষতা নিয়ে গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক মহলে নানা বক্তব্য এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক সেমিনারে বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, “আমরা এমন এক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করছি যেখানে কোনো ডিসি বা এসপি কোনো দলের ক্যাডার হিসেবে কাজ করবে না।”
তবে হাসনাত আব্দুল্লাহর অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় একটি দল ক্ষমতায় থাকার পর বর্তমানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরিতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক আনুগত্যের নতুন মেরুকরণ তৈরি হতে পারে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য একাধিকবার বলেছেন, “প্রশাসনকে কাজ করতে দিতে হবে এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে নির্বাচনকে বিতর্কিত করা কাম্য নয়।”
কুমিল্লা-৪ আসনের এই ঘটনা কেবল একটি নির্বাচনী এলাকার বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং এটি ২০২৬ সালের নির্বাচনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার আগাম বার্তা। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণের রোগ ২০২৫ সালেও পুরোপুরি সারেনি বলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই আস্থাহীনতা বিদ্যমান। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: ১. নির্বাচন কমিশন সচিবালয় প্রতিবেদন ২০২৬ - মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই নির্দেশিকা। ২. বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভ (১৯৯০-২০২৪) - বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিবর্তন। ৩. জুলাই বিপ্লব পরবর্তী প্রশাসনিক সংস্কার কমিটির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |