প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২০২৫ সালটি তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্থান ও আদর্শিক সংঘাতের এক অনন্য দলিল হয়ে থাকবে। ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে সেই ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায় সূচনা করলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদ্য পদত্যাগ করা সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। আজ সোমবার (২৯ ডিসেম্বর ২০২৫) রাজধানীর সবুজবাগ থানা নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হয়ে তিনি তার মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মাত্র দুই দিনে ৫ হাজার ভোটারের সমর্থন সংগ্রহ করে তাসনিম জারা প্রমাণ করেছেন যে, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে 'ব্যক্তি ইমেজের' প্রভাব দলীয় প্রভাবের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
বাঙালি জাতির রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লড়াই ১৯৫০-এর দশকেই দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে স্বাধিকারের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা ১৯৬৬-এর ছয় দফা এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা এনে দেয়। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী পাঁচ দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি বারবার মেরুকরণের শিকার হয়েছে।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব—প্রতিটি মোড়ে তরুণ সমাজই দিক পরিবর্তন করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের এই নির্বাচনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই প্রথম বড় দলগুলোর বাইরে 'জাতীয় নাগরিক পার্টি'র মতো নতুন শক্তিগুলো সামনে আসার চেষ্টা করছে। তবে আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটলে তরুণরা যে আপস করে না, তার প্রমাণ তাসনিম জারার এই অবস্থান।
গত শনিবার (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫) যখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতার খবরটি প্রকাশ্যে আসে, তখনই দলটিতে ভাঙনের সুর বেজে ওঠে। জামায়াতের সাথে এই কৌশলগত ঐক্যের তীব্র বিরোধিতা করে দল থেকে পদত্যাগ করেন তাসনিম জারা। তিনি ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন।
দল থেকে পদত্যাগ করলেও নির্বাচনী লড়াই থেকে পিছু হটেননি তিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের অন্তত ১ শতাংশের স্বাক্ষর বা সমর্থন প্রয়োজন হয়। তাসনিম জারার জন্য এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৬৯৩ জন ভোটারের স্বাক্ষর।
গত রবিবার (২৮ ডিসেম্বর ২০২৫) তাসনিম জারা যখন ঘোষণা দেন যে তাকে ৫ হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হবে, তখন অনেকেই বিষয়টিকে অসম্ভব বলে মনে করেছিলেন। ওই দিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, তার আরও ১ হাজার ৫০০ স্বাক্ষর প্রয়োজন। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আজ সোমবার দুপুরে তিনি প্রয়োজনীয় সব স্বাক্ষর সংগ্রহ করে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে তিনি তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘উই হ্যাভ মেইড ইট’ (আমরা পেরেছি)। তার এই জয়কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ‘আদর্শের জয়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন আদায়ের বিধানটি বড় একটি বাধা হিসেবে দেখা হয়। অতীতে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীও এই শর্ত পূরণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। ১৯৫০ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলীয় মনোনয়ন ছাড়া জয়ী হওয়া অত্যন্ত কঠিন।
তবে ২০২৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০২৪-এর বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে ভোটারদের মধ্যে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি এক ধরনের অনাস্থা কাজ করছে। এনসিপি-জামায়াত সমঝোতা নিয়ে তাসনিম জারার অবস্থান এই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।
গত ১৫ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের এক আলোচনায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেছিলেন, "নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি হবে স্বচ্ছতা ও আদর্শের।" তাসনিম জারা সেই আদর্শের পথেই হাঁটছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ঢাকা-৯ আসনের বিশাল ভোটার গোষ্ঠী এই তরুণ নারী নেতৃত্বকে ব্যালটের মাধ্যমে গ্রহণ করে কি না।
সূত্র: ১. যুগান্তর অনলাইন: (২৭-২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যার বিশেষ প্রতিবেদন ও সংবাদ)। ২. নির্বাচন কমিশন সচিবালয় (ইসি) ডাটাবেজ: ঢাকা-৯ আসনের ভোটার পরিসংখ্যান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিধিমালা। ৩. বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভ (২০২৪-২০২৫): জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন দল গঠন বিশ্লেষণ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |