চীনের বন্দিদশা থেকে ফিরে আসা দুই তরুণীর আকুতি: মানবপাচার চক্রের রহস্য ও উত্তরণ”
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
চীনের এক অপরিচিত দেশে জীবন শুন্যায় — সেখান থেকে মোবাইল ফোনে “বাঁচার আকুতি” পাঠানো এক তরুণীর নাম নীলা (ছদ্মনাম)। আরেক তরুণী হেলেনা (ছদ্মনাম) কঠিন নির্যাতন থেকে কৌশলে রেহাই পেয়ে দেশে ফিরে এসে যুগান্তরের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তাদের মিলিত বর্ণনায় উঠে এসেছে একটি নিবিড়ভাবে গড়ে ওঠা নারী পাচার চক্র, যেটি লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হতভাগ্যদের ফাঁদে ফেলছে।
নীলা ও হেলেনা দুইজনেই বলছেন, তাদেরকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল — প্রথম ধাপে সবকিছু স্বপ্নের মতো দেখানো হয়েছিল: উচ্চ বেতন, সৌন্দর্য বা পার্লার কাজ, বিদেশে উন্নত জীবন। পরে তারা বুঝতে পারলেন, তাদের অসহায়‐দুরবস্থাকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা তাদের অধিক মূল্য দিয়ে কিনে নিয়েছে এবং বিক্রয় করেছে।
হেলেনা যুগান্তরের কাছে বললেন, “আমাকে এবং আমার বান্ধবীকে চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে চীনে পাঠিয়েছিল প্রতারক চক্র। আমি দেশে ফিরলেও আমার বান্ধবী নীলা এখনো আটকা আছে। পাচারকারীরা আমার মাধ্যমেই আরও চার-পাঁচজন মেয়েকে পাঠাতে চাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, সিলভী নামে এক নারী ও তাঁর স্বামী এই চক্রের মূল সেতুবন্ধন। তারা ফেসবুকে প্রথম পরিচয় গড়েছিলেন, “চীনে বিউটি পার্লারের কাজ আছে” – এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরে তাদের কাছে জানানো হয়, “আমাদের আসলে তোমার ও বান্ধবীর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে — ৫০ লাখ টাকা করে, মোট এক কোটি টাকা।”
চক্রের সদস্যদের মধ্যে আব্বাস মোল্লা, জাহিদুল ইসলাম (বাবু) ও আকাশের নাম এসেছে। তারা দরিদ্র ও সুবিধাহীন পরিবারের তরুণীদের টার্গেট করে থাকে।
তারা পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশন—সব কিছু জাল বা অবৈধ পথে সহজেই সরবরাহ করে দেয়, এমনকি মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
এছাড়া, ২০২৫ সালের ২৮ মে, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় এক তরুণী অভিযোগ করেন, তাঁকে জোরপূর্বক চীনে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় দুই চীনা নাগরিক ও এক বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করা হয়।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৮ মে, বিমানবন্দর পুলিশ দাবি করে, চীনা নাগরিক হু জুনজুন ও ঝাং লিজি এবং বাংলাদেশি মো. নয়ন আলি এক নারীকে কারবারি পন্থায় চীনে পাচার করতে চেয়েছিলেন।
সাধারণ মানুষের তুলনায় এই চক্রগুলি দ্রুত কাজ করে — ভিসা এবং পাসপোর্ট প্রক্রিয়া মাত্র এক বা দুই দিনেই করা হয়। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সংস্থা উল্লেখ করেছেন, পাচারকারীরা পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ভিসা সেন্টার এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদেরকে ‘ম্যানেজ’ করে থাকে।
অবশেষে, এই চক্রের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ সুলতান মাহমুদ জানান, “চক্রের সদস্যদের বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি, প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে তদন্ত চলছে, শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
চীনে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিবাহপাচার ধারা (bride trafficking) রয়েছে, যেখানে দরিদ্র দেশ থেকে নারী “বিয়ে” বা “চাকরি” প্রলোভন দেখিয়ে আনা হয়।
২০২৫ সালে চীনা দূতাবাস বাংলাদেশে এক সতর্কবাণী দিয়েছিল — বিদেশী বিয়ে প্রক্রিয়াতে অনিয়ম ও পাচারের সম্ভাব্যতা রয়েছে, যারা এ ধরনের “বিয়ের ব্যবসা” করবে তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্র্যাফিকিং ইন পার্সনস প্রতিবেদন (২০২৫) বলেছে, বাংলাদেশে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়।
২০২২ সালের ট্র্যাফিকিং ইন পার্সনস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিয়োগ এজেন্সিগুলো উচ্চ কমিশন আদায় করে এবং সাব-এজেন্টদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
আন্তর্জাতিকভাবে, দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ায় মানবপাচারের সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে চীনের ভূমিকা বিষযপ্ত।
আইন ও আইন প্রয়োগের ফাঁক: বাংলাদেশে “Prevention and Suppression of Human Trafficking Act (PSHTA), ২০১২” আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ সীমিত।
দুর্বল সুরক্ষাকবচ: ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা যথেষ্ট নয়।
আন্তঃরাষ্টරීয় অভিযোজকতা প্রয়োজন: পাচারকারীরা প্রায়শই সীমান্ত পার হয়ে দেশে–দেশে আন্দোলন করে; তাই শুধু দেশসীমার মধ্যে নয়, সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা জরুরি।
জনসচেতনতা কম: গ্রামাঞ্চল ও অনগ্রসর নারীদের মধ্যে এসব পাচার চক্রগুলোর কথা অনেকেরই জানা নেই — প্রথম ধাপে বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রলোভন দেওয়া হয়।
হেলেনা এবং নীলা—দু’জনই নিজেদের অতীতকে সামনে এনে বলছেন, “এই বিপদ যেন আরও কাউকে না পোক্ত হয়।”
হেলেনা বলছেন, “আমার মতো অন্য মেয়ের জীবন নষ্ট হোক, তা আমি চাই না।”
তাদের ভয়, অভিজ্ঞতা ও অভিযোজন পুরো চক্রের গোপন গন্ডি উন্মোচন করে—যে চক্র সাধারণ সমাজে অচিহ্নিত থেকে হয়রানি চালিয়েছিল।
শক্ত ও দ্রুত তদন্ত: প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই চক্রগুলোর মূল হোতাদের ধরতে হবে।
শেল্টার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র: ফেরত আসা নারীদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল এবং মানসিক, সামাজিক সাপোর্ট প্রয়োজন।
সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম: গ্রাম ও মেয়েদের স্কুল পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালানো যেতে পারে, যাতে “চাকরি বিদেশে” প্রলোভন সহজেই ফাঁদ হিসেবে উন্মোচিত হয়।
নিয়োগ সংস্থা ও এজেন্ট নিয়ন্ত্রণ: নিয়োগ এজেন্সি ও সাব-এজেন্টদের কার্যক্রম কঠোরভাবে মনিটর ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
সীমান্ত-সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়: সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত নজরদারি ও তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে যাতে পাচার চক্র দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
দূতাবাস ও কূটনীতিক পদক্ষেপ: চীনসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে “বিয়ে পাচার” ও “চাকরি পাচার” লঙ্ঘন বন্ধে একটি বহুজাতিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ করা জরুরি।
এই প্রতিবেদনের আলোকে, নীলা ও হেলেনার কণ্ঠ থেকে উঠে আসা আবেগ, ভয়ের আভাস এবং ছবি—সেগুলো আমাদের সমাজকে জানিয়ে দিচ্ছে যে মানবপাচার একটি অচেনা কিন্তু ভয়ঙ্কর বাস্তবতা যা দ্রুতCurtailment এবং জনসচেতনতার প্রয়োজন।
“চীনে পাচার হয়েছে কয়েকশ বাংলাদেশি তরুণী, চাঞ্চল্যকর দিলেন হেলেনা” — যুগান্তর
“‘বান্ধবীসহ আমাকে ১ কোটি টাকায় কিনে নেওয়া হয়েছে’” — যুগান্তর
“চীনে পাচারের চেষ্টা: ভুক্তভোগীর অভিযোগে ধরা মানবপাচার চক্রের তিন সদস্য” — ঢাকা মেইল
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |