| বঙ্গাব্দ

যুদ্ধের মাঝেও ভার্চুয়াল সংহতিতে ইরানের তরুণরা: আশ্রয় খুঁজছে সাইবার দুনিয়ায়

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 19-06-2025 ইং
  • 5240866 বার পঠিত
যুদ্ধের মাঝেও ভার্চুয়াল সংহতিতে ইরানের তরুণরা: আশ্রয় খুঁজছে সাইবার দুনিয়ায়
ছবির ক্যাপশন: আশ্রয় খুঁজছে সাইবার দুনিয়ায়

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ভার্চুয়াল জীবনের খোঁজে ইরানের তরুণরা

তেহরান, ১৯ জুন ২০২৫
ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় বিপর্যস্ত ইরান। রাজধানী তেহরানের বহু এলাকা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। প্রাণহানি, বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা, খাদ্য সংকট—সব মিলিয়ে অচেনা এক বাস্তবতায় ঘিরে গেছে দেশটি। কিন্তু এই সংকটের মধ্যেও একটি প্রজন্ম নতুনভাবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে—এরা ইরানের জেনারেশন জেড

আলজাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নয়, বরং ভার্চুয়াল জগতে গড়ে তুলছে একধরনের প্রতিবাদ, সহানুভূতি আর জীবনের স্বপ্ন।

আতঙ্কের শহরে থেকেও ছাড়েননি

তেহরানে প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করছেন ২৪ বছর বয়সী মোমো। চারদিকে যখন বিস্ফোরণ, মৃত্যুর খবর আর অনিশ্চয়তা, তখন অনেকেই দেশ ছেড়ে পালানোর পথ খুঁজছেন। কিন্তু মোমো থেকে গেছেন। তার কণ্ঠে হতাশা নয়, বরং শেকড়ের মমতা:

“আমার জন্ম এই শহরে, আমার পরিবার, বন্ধু, স্মৃতি সব এখানে। যদি বাঁচি—এখানেই। মরলেও এখানেই।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে হলে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতেই হয়। মোমো এবং তার মতো লাখো তরুণ সেই আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন ইন্টারনেটের সাইবার জগতে

ডিসকর্ড: বেঁচে থাকার নতুন সামাজিক ঠিকানা

ইরানের জেনারেশন জেডের জন্য এখন “ডিসকর্ড” শুধু গেম খেলার মাধ্যম নয়, বরং একটা ভার্চুয়াল হোম। সেখানে গেমিংয়ের পাশাপাশি চলছে জীবনের খোঁজ-খবর, সহানুভূতির আদান-প্রদান এবং কখনো কখনো কান্নাও।

কেউ যদি নিয়মিত গ্রুপে না আসে—সদস্যদের মনে ভর করে উৎকণ্ঠা। কেউ কেউ তখন খোঁজ নেয়, হয়তো সে আহত হয়েছে, কিংবা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। এই ভার্চুয়াল উপস্থিতি এখন অনেকের কাছে বন্ধু, প্রতিবেশী এমনকি পরিবারকেও ছাড়িয়ে গেছে।

একাধিক গবেষণা মতে, প্রায় দেড় কোটি ইরানি তরুণ ডিসকর্ড ব্যবহার করেন। সেখানে এখন একধরনের ডিজিটাল সংহতি তৈরি হয়েছে, যা যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে পালানোর একটি মানসিক আশ্রয়।

হোয়াটসঅ্যাপ: যোগাযোগ, সতর্কতা ও সেবা

ডিসকর্ডের পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপও তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ সেখানে বন্ধুর জন্মদিন পালন করেন, ভিডিও কলে কান্না ভাগ করেন, আবার কেউ যুদ্ধজয়ের খবর পেলে দলবেঁধে চিৎকারে উল্লাসে মেতে ওঠেন

তবে এখানেও জটিলতা রয়েছে। ইরান সরকার সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের সতর্ক করেছে এবং অনেকের ফোন থেকে অ্যাপটি মুছে ফেলতে বলেছে। সরকারের আশঙ্কা—এর মাধ্যমে গোপন তথ্য বিদেশে পাচার হচ্ছে

তবুও, তরুণরা হোয়াটসঅ্যাপে ঘুরে দাঁড়িয়েছে নতুন উদ্যোগ নিয়ে। যেমন—গর্ভবতী নারীদের সহায়তা দিতে তৈরি হয়েছে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, যেখানে নিয়মিত শেয়ার করা হয় যোগব্যায়াম, শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ সামলানোর কৌশল। যুদ্ধের ভেতরেও মানবিকতা বাঁচিয়ে রাখার এক দুর্লভ চিত্র এটি।

অস্ত্র না, কিন্তু ডিজিটাল সংহতি

তরুণদের কেউ অস্ত্র হাতে নেয়নি, কেউ ট্যাঙ্কে চড়ে সম্মুখযুদ্ধে যায়নি। কিন্তু তারা জানিয়ে দিচ্ছে, তারা চুপ করে নেই। কেউ ডিসকর্ডে ছবি আঁকছে, কেউ যুদ্ধবিরোধী কবিতা লিখছে, কেউ আবার গান গেয়ে ফেলে দিচ্ছে রেকর্ডিং। এক প্রকার “ডিজিটাল রেজিস্ট্যান্স”—যা ইরানের সেন্সরশিপের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড. মাজিদ আলীপুর বলেন,

“এই প্রজন্ম যুদ্ধ দেখেছে, শৈশবে নিষেধাজ্ঞা, এখন বোমা। তারা জানে, বাস্তবতা পাল্টাতে না পারলেও মানসিকভাবে টিকে থাকতে হয়। ইন্টারনেট তাই তাদের অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যম।”

তিনি আরও বলেন, “এটা নিছক গেম খেলা বা চ্যাট করা নয়, বরং সংকটের মধ্যেও জীবনের জন্য আশ্রয় গড়ে তোলা।”

উপসংহার

ইরানের ধ্বংসস্তুপের মাঝেও তরুণদের মধ্যে যে উদ্যম, সহানুভূতি এবং ‘ডিজিটাল রেজিলিয়েন্স’ তৈরি হচ্ছে, তা আশাবাদের এক অনন্য উদাহরণ। তারা হয়তো বন্দুক হাতে নেয়নি, কিন্তু একে অন্যের কান্না শোনে, জন্মদিনে উইশ করে, হেরে গেলে সান্ত্বনা দেয়।

বাতাসে বারুদের গন্ধ থাকলেও, ভার্চুয়াল কাঁধে হাত রাখার এই সম্পর্ক হয়তো আগামীর ইরান গড়ার ভিত তৈরি করছে।

প্রতিবেদকBDS Bulbul Ahmed
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency