প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের ৫৩টি যুদ্ধজাহাজ ও কোস্টগার্ডের মহড়া: তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনজুড়ে তীব্র উদ্বেগ
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল থেকে তাইওয়ান প্রণালি হয়ে ফিলিপাইনের নিকটবর্তী বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমায় চীনের অন্তত ৫৩টি নৌবাহিনী ও সরকারি কোস্টগার্ড জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে তাইওয়ান। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে বেইজিংয়ের এই নজিরবিহীন সামরিক পেশিশক্তি প্রদর্শনে শুধু তাইওয়ান নয়, বরং প্রতিবেশী জাপান ও ফিলিপাইনের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও মারাত্মক উদ্বেগ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে চীনা যুদ্ধজাহাজ ও কোস্টগার্ডের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করে এক চাঞ্চল্যকর মানচিত্র প্রকাশ করেছে তাইপে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব জোসেফ উ তাঁর অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ওই মানচিত্রটি প্রকাশ করেন। মানচিত্রে অবস্থান তুলে ধরা ৫৩টি চীনা বহরের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ৩৪টিই ছিল চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির (PLAN) ভয়াল যুদ্ধজাহাজ। এ ছাড়া এই বহরে চীনের অন্যতম শক্তিশালী পরমাণু ক্ষমতাসম্পন্ন বিমানবাহী রণতরি ‘লিয়াওনিং’ (Liaoning)-এর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরে জোসেফ উ বলেন, “চীনা জাহাজগুলোর প্রতিটি গতিবিধি তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সময়ে তিনটি দেশের আশপাশে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের সামরিক তৎপরতা পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি স্পষ্ট ও মারাত্মক হুমকি।”
মানচিত্রের তথ্য ও চীনের সাফাই
তাইপের প্রকাশিত মানচিত্র অনুযায়ী, বিমানবাহী রণতরি লিয়াওনিংয়ের নেতৃত্বে চীনা যুদ্ধজাহাজের প্রধান বহরটি ফিলিপাইনের ঠিক পূর্বদিকে অবস্থান করছিল। এ ছাড়া তাইওয়ানের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের খুব কাছাকাছি কয়েকটি চীনা যুদ্ধজাহাজ অবস্থান নেয়। অন্যদিকে, জাপানের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ উপকূলের কাছে আরও তিনটি চীনা যুদ্ধজাহাজের মহড়া শনাক্ত করা হয়। এর আগে চলতি বছরের মে মাসেও একই ধরনের সামরিক মানচিত্র প্রকাশ করেছিলেন জোসেফ উ।
তবে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়লেও চীনের দাবি, এসব সামরিক তৎপরতা তাদের পূর্বনির্ধারিত নিয়মিত নৌ-প্রশিক্ষণেরই একটি অংশ। গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাং শিয়াওগাং সাংবাদিকদের বলেন, “পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে লিয়াওনিংয়ের যৌথ মহড়া একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নিয়মিত সামরিক কার্যক্রম। দূরবর্তী সমুদ্রসীমায় দীর্ঘ সময় কঠিন অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা পরীক্ষা করতেই এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এই মহড়া পরিচালনা করা হচ্ছে না।”
এদিকে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, গত মঙ্গলবার তিনটি চীনা যুদ্ধজাহাজ ও একটি কোস্টগার্ড জাহাজের আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ শনাক্ত করা হয়। জাহাজগুলো জাপানের কিউশু দ্বীপের নিকটবর্তী কৌশলগত ওসুমি প্রণালি অতিক্রম করে মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হয়।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি
সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে জাপানের সঙ্গে এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমার মালিকানা নিয়ে ফিলিপাইনের সঙ্গে বেইজিংয়ের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে।
তাইপেতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু বলেন, “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি, স্থায়িত্ব ও মুক্ত বাণিজ্য পথ বিঘ্নিত করতে পারে—এমন কোনো আগ্রাসী সামরিক শক্তি প্রদর্শন কারোর জন্যই কাম্য নয়। চীন এখনো তাইওয়ান দখলের জন্য সামরিক বলপ্রয়োগের পথ খোলা রেখেছে, তবে সম্ভাব্য সব ধরনের হুমকি মোকাবিলায় তাইওয়ানও নিজেদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াচ্ছে।”
অন্যদিকে, তাইওয়ানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফিলিপাইন সাগরে প্রশিক্ষণ শেষ করে লিয়াওনিংয়ের নেতৃত্বাধীন বহরটি উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে জাপানের দিকে যায় কিনা, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বহরটি উত্তরে গেলে তা সরাসরি জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরির কৌশল হতে পারে।
এদিকে মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৭ সালের মধ্যেই চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালাতে পারে—এমন গোয়েন্দা আশঙ্কায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৭ অক্টোবর হাওয়াইয়ে আয়োজিত একটি প্রতিরক্ষা ফোরামে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সেনাকমান্ডার জেনারেল রোনাল্ড ক্লার্ক সম্ভাব্য চীনা আক্রমণ প্রতিহত করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পূর্ণ প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, স্বশাসিত তাইওয়ানকে চীন নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে আসলেও তাইপে তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাইওয়ান সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য—দ্বীপটির স্বাধীন অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একক অধিকার কেবল সেখানকার কোটি মানুষের, কোনো বহিরাগত শক্তির নয়।