বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য: শেষ রাতের তথ্য ও গ্রেপ্তার দুই বন্ধু
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে তাঁর জীবনের শেষ রাতের চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার রাতে প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ, বারে মদ্যপান, টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়া এবং পুলিশের ধাওয়ায় পালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর বিবরণ দিয়েছেন এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। তবে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা কীভাবে শেষ পর্যন্ত তুরাগ নদে পড়ে মৃত্যুবরণ করলেন, সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।
রোববার (১ নভেম্বর) মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
শেষ রাতের ঘটনার বিবরণ ও দীপের স্বীকারোক্তি
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রিমান্ডে থাকা বন্ধু দীপ জানান, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, জারিকা তাসনিম দিশা ও তিনি নিজে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট বারে’ যান। মূলত কয়েক দিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন ও শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন—এমন তথ্য জানতে পেরেছিলেন তাহসিফ। বিষয়টি নিয়ে তাঁর মনে গভীর ক্ষোভ ও বিষণ্নতা থাকায় সেদিন দিশাকে জোরাজুরি করে বারে নিয়ে যান তিনি।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বারে গিয়ে তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে সাউন্ড সিস্টেমে বিষণ্ণ সংগীত বাজানোর অনুরোধ করেন এবং তাঁরা তিনজনই মদ্যপান শুরু করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত চলা ওই মদ্যপানের আসরে দিশার পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে তাহসিফের সঙ্গে তাঁর তুমুল কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দিশাকে উদ্দেশ করে তাহসিফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।”
রাত ১২টার দিকে বার থেকে বের হয়ে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নিজ বাসায় পৌঁছে দেন এবং দীপও তাঁর নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। এরপর দুজন মিলে টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন একটি মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। রিমান্ডে দীপ দাবি করেন, ওই মাদক স্পটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন।
টঙ্গীর মাদক স্পটে পুলিশ হানা ও পালানোর ঘটনা
দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাঠের পাশে বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে তাঁরা পায়ে হেঁটে মাঠের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে আগে থেকেই স্থানীয় বেশ কয়েকজন মাদকসেবী ও কারবারি উপস্থিত ছিলেন। মাঠে পৌঁছানোর পর তাহসিফ অত্যন্ত উচ্চস্বরে হেরোইন চান এবং যত টাকাই লাগুক না কেন তা দিতে রাজি হন। পরবর্তীতে স্থানীয় কয়েকজন মাদক কারবারির কাছ থেকে হেরোইন কিনে তা সেবন করেন তাহসিফ। বারে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর মাদক সেবনের ফলে তাহসিফ নিজের ওপর থেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে জানান দীপ।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ আরও জানান, তাহসিফ যখন মাদক সেবনে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই সেখানে পুলিশের একটি টহল দল হানা দেয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। এই আকস্মিক পরিস্থিতিতে দীপও আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান এবং নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। এই হুড়োহুড়িতে তিনি তাহসিফের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।
পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে দীপ নিজেকে বিমানবাহিনীর ‘ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু’ বা ক্ষেত্রবিশেষে নিজেই বাহিনীর ক্যাপ্টেন বলে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন। পরবর্তীতে বস্তির ভেতর থেকে কোনোভাবে মূল সড়কে ফিরে নিজের মোটরসাইকেলে এসে তাহসিফকে একাধিকবার কল করলেও তাঁর ফোন বন্ধ পান। এমনকি তাহসিফের কাছে থাকা পাওয়ার ব্যাংকের মাধ্যমে তাঁর ফোন চার্জ শেষ হয়ে গেছে ভেবে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে তাহসিফকে পানিতে পড়তে তিনি নিজের চোখে দেখেননি বলে দাবি করেছেন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক ধারণা
এদিকে ঘটনার রাতে তাহসিফ ও দীপের টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন মাঠের দিকে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, তাহসিফ দ্রুতগতিতে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁর ঠিক পেছনেই হাতে হেলমেট নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দীপ। এ সময় তাহসিফকে দীপের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, “দীপ, ডোন্ট টক টু মাচ, লেটস ওয়াক।”
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীপকে নিয়ে ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং তাঁর দেওয়া বয়ান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়েছে। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পারিপার্শ্বিক তথ্য, মোবাইল ফোন রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা—এটি কোনো ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড নয়, বরং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হতে পারে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্ধকারের মধ্যে পালাতে গিয়ে হয়তো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাহসিফ নদী বা পানিতে পড়ে গিয়ে থাকতে পারেন।
তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং রাসায়নিক বা ভিসেরা পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ময়নাতদন্তের নমুনা ও আইনি পদক্ষেপ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের সময় তাহসিফের পাকস্থলী, কিডনি, ভিসেরা এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর ডিএনএ পরীক্ষাও করা হচ্ছে।
ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মরদেহটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে থাকায় প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে তাহসিফের সাঁতার জানার কথা; ফলে তিনি এমন কোনো শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে সাঁতার কাটার সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেননি—বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকার তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। ২৯ অক্টোবর ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুরুতে মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করলেও ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বাদী হয়ে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও নৌপুলিশের যৌথ অভিযানে প্রথমে দীপকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। আদালতে হাজির করা হলে আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় রোববার (১ নভেম্বর) ঘটনার রাতে নেস্ট বারে তাহসিফের সঙ্গে থাকা তরুণী জারিকা তাসনিম দিশাকেও কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ। তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। দীপ ও দিশাকে যৌথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই এই মৃত্যুরহস্যের আসল সত্য উন্মোচিত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।