সীমিত পরিসরে চালুর ৬ দিনের মাথায় আবারও শাটডাউনে চুয়েট: সাবেক ভিসি পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
দীর্ঘ ৩৬ দিনের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাটিয়ে সীমিত পরিসরে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর মাত্র ৬ দিনের মাথায় আবারও নতুন করে শাটডাউনের মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।
নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলমের অনুপস্থিতিতে অন্য এক শিক্ষককে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদে রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে চুয়েট ক্যাম্পাসে ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে দ্রুত স্বপদে পুনর্বহাল করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠন করা পরামর্শক কমিটির কাছে ক্যাম্পাসের চলমান সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার জোরালো দাবি জানান। একই সঙ্গে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সোমবার (২ নভেম্বর) চুয়েটে একদিনের সর্বাত্মক ‘একাডেমিক শাটডাউন’ ঘোষণা করেছেন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও শিক্ষার্থীদের অবস্থান
রোববার বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বাধীনতা চত্বর’ থেকে শত শত শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি চুয়েটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়।
প্রতিবাদ সভায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলেন, “দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থার পর নিজেদের অনিশ্চিত শিক্ষাজীবনের কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরেছিল। কিন্তু নবনিযুক্ত উপাচার্যকে চুয়েট শিক্ষার্থীরা কখনোই মেনে নেয়নি। ক্যাম্পাসের কোনো প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে তাঁর হস্তক্ষেপ সাধারণ ছাত্রসমাজ চায় না। এ অবস্থায় তাঁর অনুপস্থিতিতে অন্য একজনকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের পূর্বঘোষিত স্পষ্ট অবস্থানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহতাব হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষাজীবনের সেশনের কথা ভেবে আমরা ক্লাসে ফিরেছিলাম। কিন্তু আমাদের দাবি উপেক্ষা করে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। এরই প্রতিবাদে আমরা সোমবার শাটডাউন ডেকেছি। আমাদের একমাত্র পরিষ্কার দাবি—অধ্যাপক সায়েমকে পুনরায় ভিসি হিসেবে বহাল করা হোক। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই লড়াই চলবে।”
পরবর্তীতে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার চুয়েটের সব ধরনের ক্লাস, পরীক্ষা এবং রুটিন দায়িত্বে পরিচালিত প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বর্জন করা হবে। দাবি মানা না হলে সামনে আরও কঠোর কিন্তু শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।
প্রশাসন ও শিক্ষকের বক্তব্য
এর আগে রোববার এক দাপ্তরিক ই-মেইল বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়, উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরিফুল আলমের অনুপস্থিতিতে চুয়েটের তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেনকে ভিসির রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউজিসির এক জরুরি সভায় অংশ নিতে ২ নভেম্বর ঢাকায় অবস্থানকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখতেই ১ নভেম্বর বিকেল থেকে ২ নভেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বিষয়টিকে একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা ‘রেগুলার ইস্যু’ বলে অভিহিত করেছেন অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেন। উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরিফুল আলমও দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় অবস্থানের কারণে রুটিন দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ১১ ও ১২ অক্টোবর যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আরাফাত রহমানকে দুই দিনের জন্য উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ১২ অক্টোবর ক্যাম্পাসে এসে নবনিযুক্ত উপাচার্য ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক নেতাসহ প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে উদ্ধার হন।
পটভূমি ও অনিশ্চয়তা
উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটে নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই শিক্ষার্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। পরদিনই শুরু হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। দীর্ঘ ৩৬ দিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার পর গত ২৮ অক্টোবর থেকে সীমিত পরিসরে ক্লাস শুরু হয়েছিল এবং রোববারও পুরোদমে ক্লাস চলে।
এরই মধ্যে সংকট সমাধানে ইউজিসির ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের পরামর্শক কমিটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময় করে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে প্রশাসনিক জটিলতা না মেলায় চুয়েটের একাডেমিক পঠন-পাঠন আবারও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।