গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ: 'বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন' গঠনের প্রস্তাব
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং দেশের গণমাধ্যমের উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে সম্প্রতি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই প্রতিবেদনে কমিশন ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমান ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল’ এবং সরকারপন্থী ‘সম্প্রচার কমিশন’-এর সমন্বয়ে তৈরি হবে। গণমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে এবং এটি সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে গঠিত হবে, যা দেশের গণমাধ্যমের অবাধ ও নিরপেক্ষ কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে গণ্য হবে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ২০টি সুপারিশ প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব অন্যতম। এই কমিশনের লক্ষ্য থাকবে গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা এবং স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা, যাতে সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এ ব্যাপারে কমিশন বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলেছে যে, এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে। কমিশন আরও সুপারিশ করেছে যে, প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছলতা বজায় রাখার জন্য সরকারী অর্থের ওপর নির্ভর না হয়ে গণমাধ্যমের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
কমিশন গণমাধ্যমের জন্য ২০টি সুপারিশ করেছে এবং এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বর্ণনা করা হয়েছে। এই দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে:
প্রকাশক ও সম্পাদকের যোগ্যতা নির্ধারণ: এই কমিশনটি এটি নিশ্চিত করবে যে, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত এবং ঋণখেলাপি ব্যক্তিরা গণমাধ্যমে মালিক বা সম্পাদক হতে পারবেন না।
সাংবাদিকদের নিবন্ধন ব্যবস্থা: সারাদেশে কর্মরত সাংবাদিকদের গণমাধ্যম কমিশনে নিবন্ধিত করতে হবে এবং কমিশন একটি নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে সংরক্ষণ করবে।
সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট): সাংবাদিকদের জন্য একটি আচরণবিধি তৈরি করা হবে এবং তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে।
লাইসেন্স প্রদান: সম্প্রচারমাধ্যম, যেমন টিভি ও রেডিও, এবং অনলাইন পোর্টালের লাইসেন্স প্রদান করতে কমিশন কার্যকর ভূমিকা নেবে এবং শর্তাবলী ঠিক করতে হবে।
ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রচার বন্ধ করা: ভুল বা মিথ্যা সংবাদ প্রচারের ফলে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের জন্য অভিযোগের প্রতিকার ব্যবস্থা করা হবে।
কমিশন ‘সাংবাদিকতা সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নেও গুরুত্ব দিয়েছে এবং এর খসড়া প্রস্তাব করেছে। বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু দেশ এই ধরনের আইন বাস্তবায়ন করেছে, যার ফলে সাংবাদিকরা নিরাপদে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন। কমিশন মনে করে, ‘সাংবাদিকতা সুরক্ষা আইন’-এর খসড়া দ্রুত বাস্তবায়িত হওয়া উচিত, যা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পক্ষে বড় একটি পদক্ষেপ হতে পারে।
এছাড়া, কমিশন জানাচ্ছে যে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনে মামলা হওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করা উচিত। যদি মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাবও উঠে এসেছে।
কমিশন মনে করে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার পরিবেশের উন্নতির জন্য বেশ কিছু আইন সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা রক্ষায় সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সংশোধন করা প্রয়োজন, যাতে বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধুমাত্র যুদ্ধাবস্থার সময় সীমিত থাকে। এই সুপারিশের মাধ্যমে বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের সংবিধানেও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য সুনির্দিষ্ট এবং আলাদা বিধান থাকা উচিত।
এছাড়া, কমিশন সুপারিশ করেছে যে, ফৌজদারি মানহানির সকল আইনের সংস্কার করা উচিত এবং ‘বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯, ৫০০, ৫০১, ৫০২ ধারা’ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন সংক্রান্ত মানহানির বিষয়টি গণমাধ্যম কমিশনের আওতাধীন হতে পারে। কমিশন বিশেষভাবে প্রস্তাব করেছে যে, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮’র ৯৯ (ক) এবং ৯৯ (খ) ধারার অধীনে সংবাদপত্র বাজেয়াপ্ত করার যে ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করা উচিত।
প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং তাদের বিরুদ্ধে বেআইনি অনুপ্রবেশ, নজরদারি এবং আড়িপাতার বিষয়ে একটি শক্তিশালী আইনগত কাঠামো তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশন এমন সব ঘটনার তদন্ত করার পর দোষীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বলেছে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |