প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অতীব তাৎপর্যপূর্ণ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, গভীর বন্ধুত্ব এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের (পিপল-টু-পিপল) সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও সংহত হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় দুপুরে কুয়ালালামপুরের বিলাসবহুল ‘শাংগ্রি লা’ হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর সফর ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের অর্জন নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা মাহদী আমিন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
মুখপাত্র জানান, সফরকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা। এ ছাড়া উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমনে ২টি ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ (Exchange of Notes) বিনিময় করা হয়েছে। সর্বমোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের সম্মতিতে ৩৩ দফার একটি বিশদ যৌথ বিবৃতি (Joint Statement) ইস্যু করা হয়েছে।
মাহদী আমিন জানান, সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার পাঁচটি বৃহৎ ও বিশ্বখ্যাত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা পৃথক পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—পেট্রোনাস (Petronas), আজিয়াটা (Axiata), এয়ারএশিয়া (AirAsia), পার্ডুয়া (Perodua) এবং এমএমসি পোর্ট (MMC Port)। এসব সাক্ষাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
স্বল্পসময়ের এই সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের এক দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে দুই রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে একান্ত (ওয়ান-টু-ওয়ান) বৈঠক হয়। এরপর সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে খোলামেলা আলোচনায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিক উঠে আসে। পরবর্তীতে ডেলিগেশন পর্যায়ে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল এক রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার মহামান্য রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বিশেষ রাজকীয় সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকসমূহে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও মতবিনিময় করা হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং মহামান্য রাজার সঙ্গে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা করেছেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে—অভিবাসনের ক্ষেত্রে ব্যয় যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনা হবে, পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা হবে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী সম্ভব হলে দ্রুততার সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য পুনরায় উন্মুক্তকরণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন।
পাশাপাশি, বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অবস্থায় রয়েছেন কিংবা কারাগারে অন্তরীণ (বন্দি) আছেন, তাদেরকে কীভাবে সম্পূর্ণ মানবিক ও সহানুভূতিশীল উপায়ে বৈধতার আওতায় আনা যায় অথবা প্রয়োজনে নিরাপদে দেশে ফেরত পাঠানো যায়, মালয়েশিয়ার বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সে বিষয়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন। উভয় বৈঠকেই মালয়েশিয়ার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, দ্বিপক্ষীয় সভাশেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এক যৌথ প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের মানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামের কথাও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে দুই দেশ একমত হয়েছে; বিশেষ করে এলএনজি (LNG), তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে হালাল শিল্প ও হালাল ব্যবসার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করে এ খাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে হালাল পণ্য ও সনদ প্রদান ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে একমত হয়েছেন তারা।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার, সামরিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ অংশীদারিত্বের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কীভাবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও সম্মানজনকভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা যায় এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মালয়েশিয়া কীভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আসিয়ানের (ASEAN) সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে এবং আরসিইপি (RCEP)-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মালয়েশিয়ার সক্রিয় সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে। ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান দুই নেতা।
মাহদী আমিন বলেন, "আজকের এই সফর কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।" মাত্র ১৮ ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফরে যে বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে, তা আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত রোববার (২১ জুন) দুই দিনের সফরে মালয়েশিয়া আসেন। মালয়েশিয়ার সফল সফর শেষ করে আজ সোমবার (২২ জুন) সন্ধ্যায় তিনি চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনের উদ্দেশে কুয়ালালামপুর ত্যাগ করবেন।
| প্রধান খাত ও দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডা | সফরের অর্জিত কূটনৈতিক স্থিতি ও বিবরণ |
| সফরের সময়কাল ও পরবর্তী গন্তব্য | মাত্র ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফর; আজ সন্ধ্যায় ৪ দিনের সফরে চীন যাত্রা। |
| স্বাক্ষরিত চুক্তি ও স্মারক | সংস্কৃতি বিষয়ক ১টি সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং ২টি এক্সচেঞ্জ অব নোটস। |
| যৌথ দ্বিপক্ষীয় ইশতেহার | পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৯টি খাতের ওপর ভিত্তি করে ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি। |
| শ্রমবাজার ও শ্রমিক ইস্যু | দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস ও কারাবন্দি শ্রমিকদের মানবিক মুক্তি। |
| কর্পোরেট বৈঠক | পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া ও এমএমসি পোর্টের শীর্ষ কর্তাদের সাক্ষাৎ। |
| মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বার্তা | শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের দীর্ঘ ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা। |
| কৌশলগত অর্থনৈতিক চুক্তি | দুই দেশের মধ্যে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে অগ্রগতি। |
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের লাইভ আপডেট, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতির পূর্ণাঙ্গ কপি, প্রবাসী কর ও শ্রমবাজার প্রজ্ঞাপনের সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |