| বঙ্গাব্দ

ঘরের অলস স্বর্ণেই ঘুরবে চাকা: ভারতে স্বর্ণ রিসাইক্লিংয়ের মাস্টারপ্ল্যান ও অর্থনৈতিক প্রভাব

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 02-06-2026 ইং
  • 2528 বার পঠিত
ঘরের অলস স্বর্ণেই ঘুরবে চাকা: ভারতে স্বর্ণ রিসাইক্লিংয়ের মাস্টারপ্ল্যান ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ছবির ক্যাপশন: ভারতে স্বর্ণ

ভারতীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে স্বর্ণের অবস্থান সবসময়ই অনন্য। বিয়ে, উৎসব, উত্তরাধিকার কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—সবক্ষেত্রেই ভারতীয় পরিবারগুলোতে এই মূল্যবান ধাতুর চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ নতুন স্বর্ণ আমদানির পাশাপাশি, দেশটির ঘরে ঘরে এবং মন্দিরের লকারে বিশাল এক অব্যবহৃত স্বর্ণের মজুত জমে রয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন নতুন আমদানিকৃত স্বর্ণের ওপর নির্ভর না করে ঘরে পড়ে থাকা ‘অব্যবহৃত’ স্বর্ণ রিসাইকেল বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ করেন। মূল ভাবনাটি অত্যন্ত স্পষ্ট: বিদেশ থেকে নতুন করে কেনার আগে দেশের ভেতরের অলস সম্পদকেই কাজে লাগানো।

ভারতের অলস স্বর্ণের খতিয়ান ও বিশাল মজুত

বাজার সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন পরিবার এবং মন্দির ট্রাস্টগুলোর কাছে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৩২ হাজার টন স্বর্ণ মজুত রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। কোনো কোনো সংস্থার মতে এই পরিমাণ ৩৫ হাজার টনও হতে পারে। এই বিপুল সম্পদের সিংহভাগই পড়ে রয়েছে লকার, আলমারি কিংবা সিন্দুকে। এই মজুদের সামান্য অংশও যদি মূল অর্থনীতিতে ফিরে আসে, তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

স্বর্ণের রিসাইক্লিং আসলে কী?

স্বর্ণের রিসাইক্লিং বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ হলো পুরোনো অলংকার, ভাঙা গহনা, কয়েন, স্বর্ণের বার এবং এমনকি ইলেকট্রনিক্স পণ্য থেকে স্ক্র্যাপ স্বর্ণ সংগ্রহ করে রিফাইনারির (পরিশোধনাগার) মাধ্যমে আবার খাঁটি স্বর্ণে রূপান্তর করা।

প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি

  • বিশুদ্ধতা পরীক্ষা: প্রথমে সংগৃহীত পুরোনো স্বর্ণের বিশুদ্ধতা বা ক্যারেট পরীক্ষা করা হয়।

  • গলানো ও পরিশোধন: এরপর তা গলিয়ে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিশোধন করে প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ পর্যন্ত খাঁটি স্বর্ণে রূপান্তর করা হয়।

  • নতুন পণ্য উৎপাদন: পরে এই রিফাইন করা স্বর্ণ দিয়ে আবার নতুন গহনা, কয়েন বা বার তৈরি করে বাজারে সরবরাহ চেইনে ফিরিয়ে আনা হয়।

মুথুট এক্সিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কেয়ুর শাহ বলেন, পুরোনো স্বর্ণকে ২৪ ক্যারেটের খাঁটি স্বর্ণে রূপান্তর করে পুনরায় সরবরাহ চেইনে ফিরিয়ে আনাই হলো স্বর্ণের রিসাইক্লিং।

পরিবেশগত সুবিধা

অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এর একটি বড় পরিবেশগত দিকও রয়েছে। খনি থেকে নতুন স্বর্ণ উত্তোলন অত্যন্ত জ্বালানি-নিবিড় এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। রিসাইক্লিংয়ের ফলে নতুন খনির প্রয়োজনীয়তা কমে, যা কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস করতে এবং পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

কেন এই রিসাইক্লিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার?

এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে ভারতের বিশাল আমদানি ব্যয়ের খতিয়ানে। কেবল ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই দেশের ভেতরের চাহিদা মেটাতে ভারতকে প্রায় ৭ হাজার ২৪০ কোটি (৭২.৪ বিলিয়ন) ডলারের স্বর্ণ আমদানি করতে হয়েছে।

  • বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ: চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানোর কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়।

  • চলতি হিসাবের ঘাটতি: এটি দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট বা চলতি হিসাবের ঘাটতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

সোয়স্তিকা ইনভেস্টমার্টের গবেষণা প্রধান সন্তোষ মীনা এবং চয়েস ব্রোকিংয়ের কমোডিটি অ্যানালিস্ট কাভেরি মোরে জানান, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণ রিসাইকেল করা গেলে এবং গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম সফল হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে এবং সরকারের ‘স্বনির্ভর ভারত’ নীতি গতি পাবে। সহজ কথায়, প্রতি গ্রাম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত স্বর্ণ মানে এক গ্রাম স্বর্ণ কম আমদানি করা।

সামান্য পরিবর্তন, বিশাল প্রভাব

এই উদ্যোগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, আমদানির চিত্র বদলে দিতে মানুষের অভ্যাসের খুব বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে:

ভারতের মোট পারিবারিক ও মন্দিরের মজুদের মাত্র ১ শতাংশ স্বর্ণও যদি প্রতি বছর রিসাইকেল করা যায়, তবে স্বর্ণ আমদানি প্রায় ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।

এটি কেবল স্বর্ণশিল্পেই প্রভাব ফেলবে না, বরং দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে এবং অভ্যন্তরীণ রিফাইনিং ও গহনা উৎপাদন শিল্পকে চাঙ্গা করবে।

এক নজরে: ভারতে স্বর্ণের রিসাইক্লিং ব্যবস্থার চিত্র

বিষয়ের ক্ষেত্রবর্তমান আমদানিকৃত ব্যবস্থাপ্রস্তাবিত রিসাইক্লিং ব্যবস্থা
উৎসআন্তর্জাতিক বাজার (বিদেশ থেকে আমদানি)দেশীয় পারিবারিক ও মন্দিরের অলস লকার
বার্ষিক ব্যয় (২০২৫-২৬)৭২.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারঅভ্যন্তরীণ অর্থ সচল (বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়)
অর্থনৈতিক প্রভাবরিজার্ভের ওপর চাপ ও চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধিকারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট হ্রাস ও স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি
পরিবেশগত প্রভাবখনি উত্তোলনের কারণে উচ্চ পরিবেশগত ক্ষতিপরিবেশ বান্ধব ও টেকসই (Eco-friendly) প্রক্রিয়া
গ্রাহক সুবিধাআন্তর্জাতিক বাজার মূল্যে গহনা ক্রয়জিরো ডিডাকশনে পুরোনো গহনা বদলে নতুন গহনা লাভ

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালটেন্ট ও ডিজিটাল কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট

বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের ট্রেন্ডিং খবরের বিশ্লেষণ পেতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency