মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কি আসলেই অমরত্ব অর্জন করা সম্ভব? বিগত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি ঘরোয়া আলাপচারিতা ফাঁস হয়ে যায়। সে সময় অনেকে এটিকে দুই বয়োবৃদ্ধ শাসকের খেয়ালি গল্প বলে উড়িয়ে দিলেও, অনুসন্ধানে জানা গেছে এটি কেবল সাধারণ আড্ডা ছিল না। পুতিন মূলত ক্রেমলিন-সমর্থিত দীর্ঘায়ু ও বার্ধক্যরোধ-সংক্রান্ত একটি উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের বিবরণ দিচ্ছিলেন, যা বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
সিলিকন ভ্যালির ধনকুবের জেফ বেজোস বা স্যাম অল্টম্যানদের মতো পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যরোধ গবেষণার প্রতি আগ্রহী। তবে রাশিয়ায় পুতিনের এই আকাঙ্ক্ষা এখন একটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যসূত্র অবলম্বনে তৈরি এই বিশেষ প্রতিবেদনে রাশিয়ার এই বহু বিলিয়ন ডলারের রহস্যময় প্রকল্পের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হলো।
গত মাসে রাশিয়ার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, পুতিনের ২৬ বিলিয়ন (২ হাজার ৬০০ কোটি) ডলারের ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।
বার্ধক্যরোধী জিন-থেরাপি: এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কোষের বার্ধক্য ধীরগতির করার জন্য একটি বিশেষ জিন-থেরাপি চিকিৎসা তৈরি করছেন। রাশিয়ার উপবিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কির মতে, কোষের বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ওষুধ অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল মাধ্যম হতে যাচ্ছে।
লক্ষ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধ বিতর্ক: ২০২৪ সালে উন্মোচিত এই জাতীয় দীর্ঘায়ু প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো। তবে সমালোচকদের মতে, এই সংখ্যার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত রুশ সেনাদের আনুমানিক সংখ্যার এক অদ্ভুত মিল রয়েছে।
অভিনব কোল্ড থেরাপির ব্যবহার: এই প্রকল্পের আওতায় মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় কোল্ড থেরাপির মতো অভিনব ও চরম পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
কৃত্রিম উপায়ে মানুষের প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গ তৈরি ও বার্ধক্যরোধে রুশ রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞানীরা মূলত দুটি প্রধান প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন:
১. বায়োপ্রিন্টিং (Bioprinting): জীবন্ত টিস্যুর থ্রিডি (3D) প্রিন্ট করা। ইতোমধ্যে রুশ বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি ও মানুষের তরুণাস্থি বায়োপ্রিন্ট করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তির সাহায্যে মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২. জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন (Xenotransplantation): জিনগতভাবে মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ জাতের ছোট শূকরের শরীরের ভেতরে মানুষের অঙ্গ তৈরি করা।
ক্রেমলিনের প্রেস সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলো রাষ্ট্র দ্বারা সম্পূর্ণ সমর্থিত এবং বহু বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিচ্ছে। তবে এই অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি:
মারিয়া ভোরোনৎসোভা (পুতিনের মেয়ে): তিনি একজন হরমোন বিশেষজ্ঞ এবং বর্তমানে এই জিনপ্রযুক্তি কর্মসূচির সম্পূর্ণ তদারকি করছেন।
মিখাইল কোভালচুক (বিতর্কিত পদার্থবিদ): তিনি সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ‘কুর্চাতভ ইনস্টিটিউটের’ প্রধান। তাঁর মতে, অমরত্ব নিয়ে আলোচনা করা কঠিন হলেও, মানুষকে মেরামত করার সক্ষমতা সামনে নিঃসন্দেহে বাড়বে।
পশ্চিমের জেফ বেজোস বা পিটার থিয়েলের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার মতো ক্রেমলিনের এই প্রকল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি।
রাশিয়া থেকে দেশত্যাগী বায়োপ্রিন্টিংয়ের অন্যতম পথিকৃৎ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওস্ত্রভস্কি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা না থাকা মানে সেখানে বাস্তবসম্মত কোনো ফলাফল নেই। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বিজ্ঞান বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় বিজ্ঞানীরা সম্ভবত পুতিনকে তহবিল বরাদ্দের লোভে তা-ই শোনাচ্ছেন, যা তিনি শুনতে চান।
অন্যদিকে, বিজ্ঞানী কোভালচুক এটিকে ভূরাজনৈতিক লড়াই হিসেবে দেখছেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমা বিশ্ব বিজ্ঞানের মাধ্যমে এমন একধরনের ‘সেবক বা দাস মানব’ তৈরির চেষ্টা করছে, যাদের নিজস্ব চেতনা থাকবে না।
বার্ধক্যকে জয় করার এই আকাঙ্ক্ষা রুশ বা সোভিয়েত শাসকদের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার মুখে বারবার তাদের পরাজয় ঘটেছে:
আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, ক্রেমলিনের এই ২৬ বিলিয়ন ডলারের ‘অমরত্ব প্রকল্প’ আসলে ভূ-রাজনীতি, ক্ষমতার লিপ্সা এবং বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ৭৩ বছর বয়সি পুতিন দীর্ঘদিন ধরে খালি গায়ে শিকার করে বা বরফশীতল পানিতে ডুব দিয়ে নিজের ‘চিরতরুণ’ ইমেজ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, বর্তমানে উন্নত বিশ্বের তুলনায় রাশিয়ার গড় আয়ু অনেক কম (রুশ পুরুষদের গড় আয়ু মাত্র ৬৮ বছর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ৭৬ এবং পশ্চিম ইউরোপে ৮০ বছরের বেশি)। ইউক্রেন যুদ্ধে যখন হাজার হাজার তরুণ রুশ সেনা প্রাণ হারাচ্ছে, তখন ক্রেমলিনের জন্য রাশিয়ার সাধারণ নির্বাচন বা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা যতটা সহজ, জীববিজ্ঞানের অমোঘ নিয়ম অর্থাৎ মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভবত ততটাই অসম্ভব। এটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির চেয়ে পুতিনের ব্যক্তিগত অমরত্বের একটি অলীক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা মাত্র।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |