| বঙ্গাব্দ

ট্রাম্প-ইরান চুক্তি নিয়ে নেতানিয়াহুর উদ্বেগ: ইসরাইলের গোপন আপত্তির খতিয়ান

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 24-05-2026 ইং
  • 5053 বার পঠিত
ট্রাম্প-ইরান চুক্তি নিয়ে নেতানিয়াহুর উদ্বেগ: ইসরাইলের গোপন আপত্তির খতিয়ান
ছবির ক্যাপশন: নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের ইরান চুক্তি নিয়ে ফুসছে তেল আবিব: লেবানন ও পারমাণবিক ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহুর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ

রবিবার, ২৪ মে ২০২৬: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তেহরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের চূড়ান্ত প্রস্তুতির খবরে তীব্র অসন্তোষ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশেষ করে চুক্তির দুটি সুনির্দিষ্ট ও স্পর্শকাতর দিক— লেবানন সংক্রান্ত ধারা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত মূল দরকষাকষির বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা নিয়ে ট্রাম্পের সাথে ফোনে কড়া ভাষায় নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। ইসরাইলের অফিশিয়াল পাবলিক ব্রডকাস্টার ‘কান’ ($Kan$) এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ ($Axios$)-এর কূটনৈতিক সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য আপত্তি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসান ও ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন-তেল আবিব অক্ষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ফাটলকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

১. ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও লেবানন ফ্রন্টে হিজবুল্লাহ সমীকরণ

সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে যে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, তার অধীনে মূলত আঞ্চলিক যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে ৬০ দিনের জন্য একটি বর্ধিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

এই খসড়া চুক্তির একটি বিশেষ ধারায় লেবাননে ইসরাইল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী লড়াই স্থায়ীভাবে বন্ধ করার নিখুঁত প্রস্তাব রয়েছে। তবে ইসরাইলকে আশ্বস্ত করতে চুক্তিটিতে একটি রক্ষাকবচ বা শর্ত যুক্ত করা হয়েছে—যদি হিজবুল্লাহ চুক্তি লঙ্ঘন করে কোনো ধরনের উসকানি দেয় বা নতুন করে রকেট হামলা চালায়, তবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) পাল্টা আঘাত বা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ আন্তর্জাতিক অধিকার পাবে। কিন্তু এই মৌখিক শর্তেও সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হতে পারছেন না নেতানিয়াহু।

২. পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখা: ইসরাইলের প্রধান আপত্তির জায়গা

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের মূল কারণ হলো এই চুক্তির রূপরেখায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

  • দেরিতে আলোচনা: খসড়া অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মূল ও জটিল আলোচনাগুলো এখনই শুরু হচ্ছে না। বরং ৬০ দিনের এই প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি সফলভাবে কার্যকর হওয়ার পরই কেবল পারমাণবিক বিষয়গুলো নিয়ে মার্কিন-ইরান প্রতিনিধিরা আলোচনার টেবিলে বসবেন।

  • আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি: তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জনের এই মহাবিপদকে এখনই প্রধান গুরুত্ব না দিয়ে বিষয়টিকে পরের জন্য ফেলে রাখায় সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। ইসরাইলের দাবি, এই ৬০ দিনের সুযোগে ইরান নিজের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নিতে পারে।

ট্রাম্প-ইরান চুক্তি ও ইসরাইলের আপত্তির মূল ক্ষেত্রসমূহ (মে ২০২৬)

মে ২০২৬-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি (Memorandum of Understanding) "মোটামুটি চূড়ান্ত" করার ঘোষণা দিলেও, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সে দেশের প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারকরা এই সম্ভাব্য চুক্তির ঘোর বিরোধিতা করছেন। ইসরাইলের আশঙ্কা, ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক ফায়দা ও যুদ্ধ অবসানের তাড়াহুড়ো থেকে একটি "খারাপ চুক্তি" (Bad Deal) স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হাতকে আরও শক্তিশালী করবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ক্ষেত্রে ইসরাইলের আপত্তির ৫টি মূল ক্ষেত্র নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো:
১. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পরমাণু চুল্লির বৈধতা
  • ট্রাম্পের অবস্থান: ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে আলোচনার খাতিরে বেসামরিক উদ্দেশ্যে সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের (Limited Civilian Enrichment) সুযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
  • ইসরাইলের আপত্তি: ইসরাইল ইরানের মাটিতে যেকোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের তীব্র বিরোধী। নেতানিয়াহুর স্পষ্ট দাবি, ইরানকে পরমাণু বোমা উৎপাদন থেকে রুখতে হলে তাদের কাছে থাকা সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্টকপাইল সম্পূর্ণ অপসারণ (Removed) করতে হবে এবং স্থায়ীভাবে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। 
২. ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচির অনুপস্থিতি
  • চুক্তির দুর্বলতা: আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের (যেমন- কাতার ও পাকিস্তান) ড্রাফট করা এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ড্রোন কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বাদ পড়েছে।
  • ইসরাইলের আপত্তি: সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের যুদ্ধে ইরান ইসরাইল অভিমুখে ১,০০০-এরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। এই সক্ষমতা বজায় রেখে যেকোনো চুক্তি ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।
৩. আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ককে ছাড় দেওয়া 
  • চুক্তির রূপরেখা: চুক্তিতে কেবল মার্কিন-ইরান বৈরিতা এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক দমনের শর্ত উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
  • ইসরাইলের আপত্তি: গাজা, লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইরাক এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ইরান যে অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে, তা বন্ধের সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা চুক্তিতে না থাকায় ইসরাইল ক্ষুব্ধ। 
৪. অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থায়ন
  • ট্রাম্পের প্রস্তাব: ৬০ দিনের বর্ধিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইরানকে অবাধে তেল বিক্রি করতে দেওয়া, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং তাদের ফ্রিজ হওয়া আন্তর্জাতিক তহবিল অবমুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
  • ইসরাইলের আপত্তি: ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে ইরানের বর্তমান দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতি পুনরায় চাঙ্গা হবে এবং এই বিপুল পরিমাণ তহবিল (Cash Influx) তাদের সামরিক ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হবে। 
৫. সামরিক সুযোগ হাতছাড়া হওয়া (Strategic Opportunity)
  • ইসরাইলের সামরিক হিসাব: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যৌথ মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যু এবং পরমাণু ও সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তেহরান বর্তমানে চরম ব্যাকফুটে রয়েছে।
  • ইসরাইলের আপত্তি: ইসরাইলি সামরিক নেতৃত্ব মনে করে, এটি ইরানকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়ার একটি বিরল কৌশলগত সুযোগ (Strategic Opportunity)। ট্রাম্পের এই আকস্মিক কূটনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এই সামরিক জয়কে হাতছাড়া করছে এবং তেহরানকে নতুন করে গুছিয়ে ওঠার সুযোগ দিচ্ছে।
সারসংক্ষেপ:
নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসের সাথে একান্ত বৈঠকে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আরও বড় ধরনের সামরিক হামলা (Broader Strikes) চালানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিলেও, ট্রাম্প আপাতত সামরিক সংঘাত এড়াতে কূটনীতিকেই বেছে নিয়েছেন। ট্রাম্প আগামী সপ্তাহে সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত সফরে গেলেও তাঁর সফরসূচিতে ইসরাইলকে না রাখা দুই দেশের মধ্যকার এই গভীর নীতিগত ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। 

৩. ‘পিস থ্রু স্ট্রেংথ’ বনাম ট্রাম্পের কূটনৈতিক জয়

হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তি নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী এবং তিনি এটিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের একটি বড় ট্রাম্পকার্ড হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির মাইন অপসারণ করা হবে এবং কোনো শুল্ক ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল হবে।

তবে নেতানিয়াহু বরাবরই ইরানের ওপর আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ বা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মতো বড় বিমান হামলার পক্ষে ছিলেন। ট্রাম্পের এই আকস্মিক কূটনৈতিক সমঝোতার ফলে ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে সাময়িক স্বস্তি পেয়ে যাবে, যা তেল আবিব কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ফলে উদীয়মান এই চুক্তি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ট্রাম্পের বড় জয় হলেও, তা ইসরাইলের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে।

প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed

পোর্টফোলিও লিংক: BDS Bulbul Ahmed Official Portfolio

নেতানিয়াহুর উদ্বেগ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি, লেবানন যুদ্ধবিরতি, হিজবুল্লাহ ও ইসরাইল সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক ভূ-রাজনীতির এমন গভীর, তথ্যসমৃদ্ধ ও এসইও ফ্রেন্ডলি কন্টেন্ট নিয়মিত পড়তে চোখ রাখুন বাংলাদেশ প্রতিদিন  ওয়েবসাইটে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency