| বঙ্গাব্দ

মেটা প্ল্যাটফর্মস-এ ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই: এআই পুনর্গঠন ও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ কৌশল

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 20-05-2026 ইং
  • 15805 বার পঠিত
মেটা প্ল্যাটফর্মস-এ ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই: এআই পুনর্গঠন ও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ কৌশল
ছবির ক্যাপশন: মেটা প্ল্যাটফর্মস

মেটা প্ল্যাটফর্মস-এ ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই: এআই পুনর্গঠন ও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ কৌশলের নেপথ্য কাহিনী

বুধবার, ২০ মে ২০২৬: বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা প্ল্যাটফর্মস (Meta Platforms) তাদের কর্পোরেট ইতিহাসে আরও একটি বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একটি সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনার মাধ্যমেই মূলত এই প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটে, যেখানে কর্মীদের বলা হয়েছিল—‘আজ বাসা থেকে কাজ করুন।’ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মীদের অফিসে না আসার এই নির্দেশের পর কোনো টাউনহল বৈঠক বা প্রকাশ্য আলোচনা ছাড়াই ডিজিটাল মাধ্যমে একের পর এক ছাঁটাইয়ের নোটিশ বা ই-মেইল আসতে শুরু করে। মেটা তাদের মোট কর্মশক্তির প্রায় ১০ শতাংশ অর্থাৎ আনুমানিক ৮,০০০ কর্মী ছাঁটাই করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার প্রথম ধাক্কাটি এসেছে মেটার সিঙ্গাপুর হাব থেকে।

সিঙ্গাপুরে ভোর ৪টায় ছাঁটাইয়ের মেইল: ‘নীরব’ ছাঁটাইয়ের কৌশল

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গ (Bloomberg)-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুরে কর্মরত ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা স্থানীয় সময় ভোর ৪টায় তাদের চাকরিচ্যুতির অফিশিয়াল ই-মেইল পান। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন টাইম জোন অনুযায়ী ধাপে ধাপে এই নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।

কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় ছিল মেটা প্রশাসনের অনুসৃত ঘটনাক্রম—প্রথমে সবাইকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাসা থেকে কাজের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং এরপরই ছাঁটাইয়ের মেইল পাঠানো হয়। অনেক কর্মীর ধারণা, অফিসে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, আকস্মিক ক্ষোভ বা প্রতিবাদের দৃশ্য তৈরি না হয়, সেজন্যই অত্যন্ত চতুরতার সাথে বাসা থেকে কাজের বাহানায় এই ছাঁটাই প্রক্রিয়াটি ‘নীরবে’ সম্পন্ন করেছে মেটা কর্তৃপক্ষ।

এআই (AI) পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে মেটার মেগা বাজেট ও ছাঁটাই

এই ছাঁটাই কার্যক্রমের আগে মেটা প্ল্যাটফর্মস-এ মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮,০০০। বর্তমান সিদ্ধান্তের ফলে হাজারো কর্মী চাকরি হারাচ্ছেন, আবার অনেককে অভ্যন্তরীণ নতুন বিভাগে স্থানান্তর করা হচ্ছে। মেটার এই ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তনের মূল কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

  • এআই টিমে পুনর্বিন্যাস: কোম্পানির চিফ পিপল অফিসার জ্যানেল গেইল এক অভ্যন্তরীণ মেমোতে জানিয়েছেন, ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি ৭,০০০ কর্মীকে সম্পূর্ণ নতুন এআই-ভিত্তিক টিমে পুনর্বিন্যাস করা হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৬,০০০ শূন্য পদ স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা স্তরও (Management Layer) উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হচ্ছে।

  • সমতল সাংগঠনিক কাঠামো: মেটা এখন অনেক বিভাগকে আরও সমতল কাঠামোতে (Flatter Structure) নিয়ে আসছে, যাতে ছোট ছোট টিম বা গ্রুপের মাধ্যমে দ্রুত ও বেশি দায়িত্ব নিয়ে কাজ সম্পন্ন করা যায়। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে প্রকৌশল (Engineering) ও পণ্য উন্নয়ন (Product Development) বিভাগে।

  • ১৪৫ বিলিয়ন ডলারের এআই ইনভেস্টমেন্ট: মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কোম্পানির প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ২০২৬ সালের জন্য মেটা ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এক বিশাল মহাপরিকল্পনা করেছে, যার সিংহভাগই বিনিয়োগ করা হবে জেনারেটিভ এআই এবং মেটার নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) খাতের উন্নয়নে।

প্রযুক্তি খাতে চলমান ছাঁটাইয়ের ঢেউ (মে ২০২৬)

মে ২০২৬-এ প্রযুক্তি খাতের ছাঁটাইয়ের সার্বিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
মে ২০২৬-এর প্রধান ছাঁটাই এবং বড় কোম্পানিগুলোর অবস্থান 
  • মেটা (Meta): ২০ মে ২০২৬ থেকে মেটা তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যার অধীনে ১০% কর্মী বা প্রায় ৮,০০০ কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে এবং ৬,০০০ খালি পদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে.
  • পেপ্যাল (PayPal): মে মাসে পেপ্যাল তাদের মোট জনবলের প্রায় ২০% (আনুমানিক ৪,৮০০ কর্মী) ছাঁটাইয়ের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে.
  • সিসকো (Cisco): নেটওয়ার্কিং জায়ান্ট সিসকো তাদের চতুর্থ প্রান্তিকের অংশ হিসেবে মে মাসে প্রায় ৪,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে.
  • ক্লাউডফ্লেয়ার (Cloudflare): সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক এই প্রতিষ্ঠানটি মে মাসের শুরুতে তাদের গ্লোবাল ওয়ার্কফোর্সের ২০% বা ১,১০০ জনেরও বেশি কর্মী ছাঁটাই করেছে.
  • মাইক্রোসফট (Microsoft): এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে কোম্পানিটি হাজার হাজার কর্মীর জন্য স্বেচ্ছায় অবসর বা 'বাইআউট' কর্মসূচি চালু করেছে.
  • ওরাকল (Oracle): ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় একক ছাঁটাই করেছে ওরাকল, যারা ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের জন্য পর্যায়ক্রমে ৩০,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে. 
প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাইয়ের মূল কারণসমূহ 
  • এআই-কেন্দ্রিক রূপান্তর (AI-First Model): কোম্পানিগুলো মানুষের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ঘাটতি এআই দিয়ে পূরণ করছে. মেটা এবং ক্লাউডফ্লেয়ারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের চেয়ে এআই চ্যাটবট এবং অটোমেশনকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে.
  • বিপুল পরিমাণ এআই অবকাঠামো ব্যয়: জেনারেটিভ এআই এবং উন্নত ডেটা সেন্টার নির্মাণে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হচ্ছে. উদাহরণস্বরূপ, মেটা ২০২৬ সালে তাদের এআই অবকাঠামো ব্যয় বাড়িয়ে ১১৫ থেকে ১৩৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে ঠেকিয়েছে, যা সামাল দিতে সাধারণ কর্মী কমানো হচ্ছে.
  • করোনা মহামারীর অতিরিক্ত নিয়োগ সংশোধন: ২০২০-২০২২ সালের মহামারীর সময়ে প্রযুক্তি খাতে যে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ (Over-hiring) করা হয়েছিল, কোম্পানিগুলো এখন তা কমিয়ে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে
২০২৬ সালের ছাঁটাইয়ের পরিসংখ্যানগত তুলনা
সময়কাল / বছর মোট ছাঁটাইকৃত কর্মীদৈনিক গড় চাকরিচ্যুতি
২০২৬ (১ জানুয়ারি - ২০ মে)১,১৩,৮৬৩+ জন৮১৩ জন
২০২৫ (পূর্ণাঙ্গ বছর)২,০৫,৭৭৩ জন৫৬৪ জন
২০২৬ সালের মে মাস (প্রথম দুই সপ্তাহ)প্রায় ২৫,০০০ জন১,৭৮৫+ জন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছাঁটাই কেবল কোনো সাময়িক মন্দা নয়, বরং প্রযুক্তি বিশ্বের কাজের ধরনের একটি স্থায়ী রূপান্তর. কর্মক্ষেত্রে এখন সাধারণ কোডার বা টেকনিশিয়ানদের চেয়ে এআই বিশেষজ্ঞ এবং ডেটা সায়েন্টিস্টদের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে. 

কর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক, ক্ষোভ ও পিটিশন

গত মাসে মেটার এই ছাঁটাইয়ের তথ্য অভ্যন্তরীণভাবে ফাঁস হওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে চরম উদ্বেগ বাড়তে থাকে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই অনেক কর্মী ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা থেকে অফিসের বিনামূল্যের খাবার ও অতিরিক্ত ল্যাপটপ চার্জার সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন।

একই সময়ে খবর আসে, কর্মীদের মাউসের নড়াচড়া ও কিবোর্ড ব্যবহারের তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নতুন অভ্যন্তরীণ এআই টুল চালু করেছে মেটা, যা দিয়ে কর্মীদের কাজের দক্ষতা মেপে তা এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হবে। এই কড়া নজরদারির বিরুদ্ধে মেটার এক হাজারের বেশি কর্মী তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটি যৌথ পিটিশনে সই করেছেন।

‘এটি সাময়িক সংকট নয়, বরং স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন’

গ্লোবাল টেক ট্রেন্ড এবং প্রযুক্তি খাতের এই আকস্মিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিডোকিউর প্রধান নির্বাহী দীপল দত্ত এক দূরদর্শী বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি কোনো সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা বা সংকট নয়, বরং প্রযুক্তি খাতে স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

জেনারেটিভ এআই ও স্বয়ংক্রিয় কর্মপ্রবাহ (Automated Workflows) এখন নিয়মিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, কাস্টমার সার্ভিস ও ডাটা ম্যানেজমেন্টের মতো কাজগুলোকে অত্যন্ত সাধারণ কাজে পরিণত করেছে। ফলে অতীতে কর্মীসংখ্যা বাড়িয়ে কোম্পানির প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে প্রচলিত ‘টেক মডেল’ ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ২০২৬ সাল এবং এর পরবর্তী সময়ে শুধু সাধারণ কোড লেখা নয়, বরং জটিল এআই-ভিত্তিক সিস্টেম পরিচালনা ও হাই-লেভেল আর্কিটেকচারাল নকশা তৈরির দক্ষতাই হবে বৈশ্বিক আইটি বাজারের মূল চাহিদা।

প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed

সিলিকন ভ্যালির খবর, মেটা প্ল্যাটফর্মস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের চাকরি এবং সমসাময়িক আইটি ট্রেন্ডের গভীর ও প্রফেশনাল ইনফরমেশনাল কন্টেন্ট পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন বাংলাদেশ প্রতিদিন  ওয়েবসাইটে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency